নয়াদিল্লি, ৩০ জুলাই: ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা ভূখণ্ডে চলমান সামরিক অভিযানের মুখে ইসরায়েলকে ক্রমাগত সামরিক সরঞ্জাম ও অস্ত্র রফতানি করে যাওয়ার ঘটনায় আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ভারতের বিরুদ্ধে এক চাঞ্চল্যকর তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সংস্থার নতুন অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলা হয়েছে, অবরুদ্ধ গাজায় ফিলিস্তিনিদের ওপর চলা গণহারে ধ্বংসযজ্ঞ এবং গণহত্যার মতো গুরুতর অপরাধে ভারত সরকার ও ভারতীয় প্রতিরক্ষা সংস্থাগুলো পরোক্ষভাবে শরিক বা অপরাধের সহযোগী (Complicity) হয়ে পড়ার মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের প্রকাশিত ওই বিশেষ প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর থেকে শুরু হওয়া ইসরায়েলি সামরিক অভিযান সত্ত্বেও ভারত এবং ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা খাতের মধ্যকার ব্যবসায়িক ও কৌশলগত সম্পর্ক কমেনি, বরং আরও জোরদার হয়েছে। বহু ক্ষেত্রে ভারত সরকার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নিয়ন্ত্রিত প্রতিরক্ষা সংস্থাগুলোর মাধ্যমে ইসরায়েলকে সামরিক রসদ সরবরাহ অব্যাহত রেখেছে, যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের গুরুতর লঙ্ঘন।
‘মেড ইন ইন্ডিয়া’: অ্যামনেস্টির অনুসন্ধানী তথ্য ও চালান বিশ্লেষণ
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ‘মেড ইন ইন্ডিয়া: দ্য সাপ্লাই অব ওয়েপনস অ্যান্ড অ্যাজ়িউনিশন টু ইসরায়েল’ শীর্ষক নতুন তদন্ত প্রতিবেদনে ভারত ও ইসরায়েলের মধ্যে হওয়া অন্তত ২,৫৯৬টি অস্ত্রের চালানের পুঙ্খানুপুঙ্খ তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত সময়কালের মধ্যে ভারত থেকে ইসরায়েলে পাঠানো সামরিক সরঞ্জামের বিশাল ডেটাবেস বিশ্লেষণ করেছেন মানবাধিকার গবেষকরা।
সংস্থার দেওয়া তথ্যানুযায়ী, এই দীর্ঘ সময়ে ভারতীয় কোম্পানিগুলো থেকে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর প্রধান সরবরাহকারী সংস্থাগুলোতে অন্তত ৩,৯০,৫১৬টি আগ্নেয়াস্ত্রের খুচরো যন্ত্রাংশ, ৫,৬৪,৯৭০টি বিস্ফোরক জাতীয় গোলাবারুদের অংশ (যেমন ড্রোনের ওয়ারহেড, কামানের গোলার কেসিং) এবং ২৯৮টি সামরিক যুদ্ধযানের গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ রফতানি করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, সম্পূর্ণ সামরিক ব্যবহারের উপযোগি সরঞ্জাম ছাড়া সাধারণ বেসামরিক ব্যবহারের সম্ভাবনা থাকা কোনো পণ্যের তথ্য এই পরিসংখ্যানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। এছাড়া অ্যান্টি-মিসাইল ডিফেন্স ব্যবস্থার মতো আত্মরক্ষামূলক প্রযুক্তিকে হিসাবের বাইরে রেখেই এই বিশদ পরিসংখ্যান প্রকাশ করা হয়েছে।
কোন কোন ভারতীয় ও ইসরায়েলি সংস্থা জড়িত?
অ্যামনেস্টির তদন্তে ভারতের বেশ কয়েকটি শীর্ষস্থানীয় সরকারি ও বেসরকারি প্রতিরক্ষা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের নাম উঠে এসেছে। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য:
১. পিএলআর সিস্টেমস প্রাইভেট লিমিটেড (PLR Systems): আদানি ডিফেন্স অ্যান্ড অ্যারোস্পেস এবং ইসরায়েল ওয়েপন ইন্ডাস্ট্রিজ (IWI)-এর যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত এই সংস্থাটি ইসরায়েলি সেনার ব্যবহৃত মেশিনগানের যন্ত্রাংশ সরবরাহ করে।
২. মুনিশন্স ইন্ডিয়া লিমিটেড (Munitions India Limited): ভারত সরকারের মালিকানাধীন এবং স্বরাষ্ট্র/প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের নিয়ন্ত্রণাধীন এই রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাটি থেকে ১৫৫ মিলিমিটারের অতি-বিস্ফোরক কামানের গোলা (155mm High Explosive Artillery Shells) রফতানি করা হয়েছে।
৩. আলফা এলসেক ডিফেন্স অ্যান্ড অ্যারোস্পেস (Alpha Elsec): এলবিট সিস্টেমসের সাথে যৌথভাবে চালিত এই সংস্থা থেকে ‘স্কাইস্ট্রাইকার’ ড্রোন বা সুইসাইড ড্রোনের জন্য মারাত্মক বিস্ফোরক ওয়ারহেড পাঠানো হয়েছে। গাজার খান ইউনিসে ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকে এই ধরনের ড্রোনের অবশিষ্টাংশ পাওয়া গিয়েছিল বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়।
৪. ইন্দো এমআইএম এবং কল্যাণী সিস্টেমস (Kalyani Systems): ভারত ফোর্জের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান কল্যাণী সিস্টেমস এবং ইন্দো এমআইএম-এর মতো বেসরকারী সংস্থা ভারী অস্ত্র ও সামরিক যানের যন্ত্রাংশ সরবরাহে যুক্ত ছিল।
অপরদিকে, এই সামগ্রীগুলো গ্রহণ করেছে ইসরায়েলের মূল সামরিক সরবরাহকারী সংস্থা যেমন— এলবিট সিস্টেমস (Elbit Systems), রাফায়েল অ্যাডভান্সড ডিফেন্স সিস্টেমস (Rafael) এবং ইসরায়েল অ্যারোস্পেস ইন্ডাস্ট্রিজ (IAI)।
আন্তর্জাতিক আইন, গণহত্যা কনভেনশন এবং ভারতের দায়
জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (ICJ) গাজায় ফিলিস্তিনিদের ওপর গণহত্যার ঝুঁকির বিষয়টি স্বীকার করে যে অন্তর্বর্তীকালীন নির্দেশিকা বা ‘প্রভিশনাল মেজার্স’ জারি করেছিল, তার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে অ্যামনেস্টি জানিয়েছে— ভারত সরকার কখনোই দাবি করতে পারে না যে তারা এই অস্ত্র রফতানির পরিণতি সম্পর্কে অজ্ঞ ছিল।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মহাসচিব অ্যাগনেস ক্যালামার্ড (Agnès Callamard) এক বিবৃতিতে কড়া ভাষায় জানিয়েছেন, “আন্তর্জাতিক আদালতের সতর্কবার্তা সত্ত্বেও ভারতের সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাগুলো গাজায় ধ্বংসযজ্ঞের মাঝেও নিজেদের মুনাফা বাড়াতে ইসরায়েলকে অস্ত্রের যন্ত্রাংশ সরবরাহ করে গেছে। জেনেভা কনভেনশন এবং ১৯৪৮ সালের গণহত্যা প্রতিরোধ কনভেনশন (Genocide Convention) অনুযায়ী, প্রতিটি রাষ্ট্রের দায়িত্ব আন্তর্জাতিক অপরাধ বা গণহত্যা রোধ করা। জানা সত্ত্বেও এই ধরনের অস্ত্র স্থানান্তর অব্যাহত রেখে ভারত সরকার গণহত্যা ঠেকানোর আন্তর্জাতিক আইনি বাধ্যবাধকতা স্পষ্ট লঙ্ঘন করেছে।”
ক্যালামার্ড আরও যোগ করেন যে, যেসব বাণিজ্যিক সংস্থা এই ধরনের সরবরাহ শৃঙ্খলে যুক্ত রয়েছে, তারা যদি জানে যে তাদের উৎপাদিত যন্ত্রাংশ আন্তর্জাতিক মানবিক আইন লঙ্ঘনে ব্যবহার করা হতে পারে, তবে ভবিষ্যতে তাদের কর্মকর্তা বা দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনে ব্যক্তিগত ফৌজদারি দায়বদ্ধতা (Criminal Responsibility) তৈরি হতে পারে।
রফতানি নীতিতে গলদ ও স্বচ্ছতার অভাব
প্রতিবেদনে ভারতের অস্ত্র রফতানি সংক্রান্ত জাতীয় আইনি কাঠামোর চরম ব্যর্থতার কথা তুলে ধরা হয়েছে। আন্তর্জাতিক ‘আর্মস ট্রেড ট্রিটি’ (ATT)-তে ভারতের স্বাক্ষর না করার বিষয়টি উল্লেখ করে অ্যামনেস্টি জানিয়েছে, ভারতের বর্তমান অস্ত্র রফতানি নীতিতে কোনো নির্দিষ্ট মানবাধিকাক সতর্কতামূলক নিয়মাবলী বা ‘হিউম্যান রাইটস ডিউ ডিলিজেন্স’ যুক্ত নেই। এর ফলে সম্পূর্ণ গোপনীয়তা ও জবাবদিহিতার অভাব তৈরি হয়েছে, যা বেআইনি সামরিক রফতানিকে প্রশ্রয় দিচ্ছে।
সংস্থাটি দাবি করেছে, ২০২৬ সালের জুন এবং জুলাই মাসে তারা ভারত সরকার এবং চিহ্নিত নয়টি রফতানিকারক সংস্থার কাছে এই তদন্তের তথ্য পাঠিয়ে সুস্পষ্ট বক্তব্য জানতে চেয়ে চিঠি দিয়েছিল। কিন্তু সরকারের তরফ থেকে বা ওই সংস্থাগুলোর কাছ থেকে কোনো জবাব বা প্রতিক্রিয়া মেলেনি।
অবিলম্বে অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা আরোপের দাবি
গাজায় ফিলিস্তিনি বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এবং আন্তর্জাতিক আইনের শাসন বজায় রাখতে অ্যামনেস্টি বিশ্ব সম্প্রদায়ের পাশাপাশি ভারত সরকারের কাছে কয়েকটি নির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে:
- অবিলম্বে অস্ত্র রফতানি বন্ধ: ভারত সরকারকে অভিলম্বে ইসরায়েলে যেকোনো ধরনের সরাসরি বা পরোক্ষ অস্ত্র, আমদানিকৃত সরঞ্জাম, বিস্ফোরক ও যন্ত্রাংশ রফতানির ছাড়পত্র বাতিল করতে হবে।
- কঠোর তদারকি: ভারতের বিচারব্যবস্থার অধীনে পরিচালিত কোনো কোম্পানি যেন আন্তর্জাতিক অপরাধে কোনোভাবে আর্থিক বা পরোক্ষ সমর্থন না জোগায় তা নিশ্চিত করতে হবে।
- আন্তর্জাতিক চুক্তিতে যোগদান: ভারতকে অবিলম্বে ‘আর্মস ট্রেড ট্রিটি’ (ATT)-তে যোগ দিয়ে নিজেদের রফতানি নীতি বিশ্বমানের মানবতাবাদী নীতিমালার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
ইসরায়েলের ওপর পূর্ণাঙ্গ আন্তর্জাতিক অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা (Arms Embargo) আরোপ না হওয়া পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে এই ধরনের সরবরাহ শৃঙ্খল বন্ধে সোচ্চার থাকার কথা পুনর্ব্যক্ত করেছে আন্তর্জাতিক এই অধিকার রক্ষা সংস্থাটি।
সম্পূর্ণ রিপোর্ট পড়ুন https://www.amnesty.org/en/latest/news/2026/07/india-continuing-weapons-exports-to-israel-could-risk-complicity-in-ongoing-genocide-in-gaza-new-investigation/
বাংলাকাল-কে ফলো করুন।
Discover more from বাংলাকাল
Subscribe to get the latest posts sent to your email.

