তামিলনাড়ু রাজ্যে গো-বধ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার বিষয়ে মাদ্রাজ হাইকোর্টের একটি সাম্প্রতিক নির্দেশকে কেন্দ্র করে জাতীয় রাজনীতি ও আইনি মহলে শোরগোল পড়ে গিয়েছে। হাইকোর্টের এই ঢালাও রায়কে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে এবার দেশের শীর্ষ আদালত অর্থাৎ সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছে তামিলনাড়ু সরকার। রাজ্যের দাবি, আদালতের এই নিষেধাজ্ঞা রাজ্য সরকারের নিজস্ব বিদ্যমান আইনি কাঠামোর পরিপন্থী এবং আইনসভার এক্তিয়ারে বিচারবিভাগের হস্তক্ষেপের শামিল। পশ্চিমবঙ্গ-সহ দেশের বিভিন্ন মহলেও এই আইনি লড়াইকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
আইনি জটিলতার সূত্রপাত ঘটেছিল গত মে মাসে, পবিত্র ঈদুজ্জোহা বা বকরি ঈদের ঠিক আগে। ‘হিন্দু মক্কল কাচ্চি’ নামক একটি সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক কে. সূর্য প্রশান্ত মাদ্রাজ হাইকোর্টে একটি জনস্বার্থ মামলা দায়ের করেছিলেন। তাঁর আবেদনে মূল দাবি ছিল, বকরি ঈদ বা অন্য যেকোনো উৎসবের সময় সাধারণ জনসমক্ষে কিংবা যত্রতত্র পশু জবাই না করে কেবল প্রশাসন নির্ধারিত নির্দিষ্ট স্থানেই যেন তা করা হয়।
কিন্তু মামলার শুনানির পর মাদ্রাজ হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ মূল আবেদনের পরিধি ছাড়িয়ে এক ঐতিহাসিক ও কঠোর নির্দেশ জারি করে। আদালত রাজ্যের মুখ্য সচিব এবং পুলিশ প্রশাসনকে নির্দেশ দেয় যে, বকরি ঈদ কিংবা অন্য যেকোনো দিন—রাজ্যের কোথাও যেন কোনো গরু বা বাছুর জবাই করা না হয়। এই রায় দেওয়ার ক্ষেত্রে হাইকোর্ট ১৯৭৬ সালের একটি পুরনো সরকারি নির্দেশিকাকে ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করে, যা মূলত দুগ্ধ উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে গ্রামীণ অর্থনীতি জোরদার করতে জারি হয়েছিল।
মাদ্রাজ হাইকোর্টের এই সর্বাত্মক নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে বিশেষ অনুমতি আবেদন (SLP) দাখিল করেছে তামিলনাড়ু সরকার। রাজ্যের পক্ষ থেকে আবেদনে স্পষ্ট জানানো হয়েছে যে, হাইকোর্টের এই রায় ‘তামিলনাড়ু পশু সংরক্ষণ আইন, ১৯৫৮’-এর সম্পূর্ণ পরিপন্থী। এই আইনের ৪ নম্বর ধারা অনুযায়ী, ১০ বছরের বেশি বয়সী কোনো গরু যদি প্রজনন বা শ্রমের জন্য অনুপযুক্ত হয়ে পড়ে, তবে উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় শংসাপত্র বা সার্টিফিকেট নিয়ে তা জবাই করার আইনি অনুমতি রয়েছে। হাইকোর্ট এই প্রচলিত আইনটিকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করেছে।
তামিলনাড়ু সরকার সুপ্রিম কোর্টে আরও অভিযোগ করেছে যে, এটি এক ধরনের বিচারবিভাগীয় অতিসক্রিয়তা। মূল আবেদনকারী যেখানে কেবল নির্ধারিত স্থানে পশু জবাইয়ের নিয়ম কার্যকর করার দাবি জানিয়েছিলেন, সেখানে হাইকোর্ট স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে পুরো রাজ্যেই গো-বধ নিষিদ্ধ করে দিয়েছে। রাজ্য সরকারের মতে, আদালত এখানে প্রচলিত বিধিবদ্ধ আইনকে পাশ কাটিয়ে ‘বিচারবিভাগীয় আইন প্রণয়ন’-এর চেষ্টা করেছে, যা আদালতের এক্তিয়ারের বাইরে পড়ে।
আবেদনে রাজ্য সরকারের তরফ থেকে আরও মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, ‘পশু ক্রূরতা প্রতিরোধ আইন ১৯৬০’ এবং ‘তামিলনাড়ু নগর স্থানীয় সংস্থা বিধি ২০২৩’-এর মতো আইনগুলো পশু জবাইয়ের পুরো প্রক্রিয়াটিকে নিয়ন্ত্রণ ও সুশৃঙ্খল করতে ব্যবহৃত হয়, কিন্তু তা কোনোভাবেই সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার কথা বলে না। ফলে ঢালাও নিষেধাজ্ঞা জারির কোনো আইনি ভিত্তি থাকতে পারে না।
বর্তমানে এই স্পর্শকাতর মামলাটি সুপ্রিম কোর্টের বিবেচনাধীন রয়েছে। দেশের শীর্ষ আদালত তামিলনাড়ু সরকারের এই আবেদনের প্রেক্ষিতে কী সিদ্ধান্ত নেয় এবং রাজ্য আইনের বৈধতা কীভাবে রক্ষা করা হয়, এখন সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছে দেশের রাজনৈতিক ও আইনি মহল। পশ্চিমবঙ্গ থেকেও বহু আইনবিদ ও সচেতন নাগরিক এই মামলার গতিপ্রকৃতির ওপর তীক্ষ্ণ নজর রাখছেন
Discover more from বাংলাকাল
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
