মহাত্মা গান্ধী গ্রামীণ কর্মসংস্থান প্রকল্পের বদলে এল বিকশিত ভারত গ্যারান্টি, প্রথম মাসেই কাজের সুযোগ কমল প্রায় ৫০ শতাংশ

মহাত্মা গান্ধী গ্রামীণ কর্মসংস্থান প্রকল্পের বদলে এল বিকশিত ভারত গ্যারান্টি, প্রথম মাসেই কাজের সুযোগ কমল প্রায় ৫০ শতাংশ

নয়াদিল্লি, ১০ অগাস্ট:

কেন্দ্রীয় সরকারের নতুন গ্রামীণ কর্মসংস্থান প্রকল্পে কাজের সুযোগ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। দীর্ঘ দুই দশকের পুরোনো মহাত্মা গান্ধী জাতীয় গ্রামীণ কর্মসংস্থান নিশ্চয়তা প্রকল্প বা এমজিএনআরইজিএস-এর বদলে গত ১ জুলাই থেকে সারা দেশে ‘বিকশিত ভারত-গ্যারান্টি ফর রোজগার অ্যান্ড আজীবিকা মিশন (গ্রামীণ)’ বা ভিবি-জি র‍্যাম জি প্রকল্প চালু হয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, নতুন এই প্রকল্পের প্রথম মাসেই অর্থাৎ জুলাই মাসে গত বছরের তুলনায় কর্মসংস্থান সৃষ্টির হার প্রায় ৪৯.৯৪ শতাংশ কমে গিয়েছে। নতুন প্রকল্পে মজুরি এবং কাজের দিন বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও বাস্তবের পরিসংখ্যান ভিন্ন কথা বলছে।

গত ৯ অগাস্ট প্রকাশিত সরকারি পরিসংখ্যানে দেখা গিয়েছে, ২০২৬ সালের জুলাই মাসে নতুন প্রকল্পের অধীনে মাত্র ৭.৬৭ কোটি শ্রম-দিবস তৈরি হয়েছে। গত বছর ঠিক একই সময়ে পুরোনো মহাত্মা গান্ধী গ্রামীণ কর্মসংস্থান প্রকল্পের আওতায় ১৫.৩৩ কোটি শ্রম-দিবস তৈরি হয়েছিল। শ্রম-দিবস হলো এমন একটি একক, যা একজন ব্যক্তির এক কর্মদিবসে সম্পন্ন করা আদর্শ কাজের পরিমাণের উপর ভিত্তি করে হিসাব করা হয়। যদিও গ্রামোন্নয়ন মন্ত্রকের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, নতুন প্রকল্পের বাস্তবায়নের প্রথম মাসে প্রায় ৯ কোটি শ্রম-দিবস তৈরি হয়েছে। সরকারি ড্যাশবোর্ডের তথ্য বলছে, কর্মসংস্থান যোজনায় অংশ নেওয়া পরিবারের সংখ্যাও ৫১.৪৫ শতাংশ কমেছে। গত বছর জুলাই মাসে যেখানে ১.৪২ কোটি পরিবার কাজ পেয়েছিল, সেখানে এই বছর জুলাইয়ে তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৬৮.৯৪ লাখে।

গত পাঁচ বছরে গ্রামীণ কর্মসংস্থান প্রকল্পে কাজ পাওয়া পরিবার এবং শ্রম-দিবসের নিরিখে এটিই সর্বনিম্ন পরিসংখ্যান। পূর্ববর্তী চার বছরে গড়ে ১.৭২ কোটি পরিবার এই প্রকল্পের সুবিধা পেয়েছিল, যার তুলনায় এই বছর মাত্র ৪০ শতাংশেরও কম পরিবার কাজ পেয়েছে। একইভাবে, গত চার বছরে গড়ে ২১.৫৬ কোটি শ্রম-দিবস তৈরি হলেও, চলতি বছরের জুলাইয়ে তার মাত্র ৩৫ শতাংশ অর্জিত হয়েছে। বিগত ইউপিএ আমলের পুরোনো প্রকল্পে কর্মসংস্থান হ্রাসের এই ধারা গত বছর মার্চ মাস থেকেই শুরু হয়েছিল এবং তা ২০২৬ সালের জুন মাস পর্যন্ত অব্যাহত ছিল।

চলতি বছর বর্ষার খামখেয়ালিপনার কারণে কর্মসংস্থান কমে যাওয়ার এই বিষয়টি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। আবহাওয়া দফতর বা আইএমডি-র রিপোর্ট অনুযায়ী, ১ জুন থেকে ৩ অগাস্ট পর্যন্ত দেশের ৭৪১টি জেলার মধ্যে অর্ধেক জেলাতেই স্বাভাবিকের চেয়ে কম বৃষ্টিপাত হয়েছে, এমনকি কিছু জেলায় বৃষ্টির ঘাটতি মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছেছে। এই পরিস্থিতিতে অদক্ষ কৃষি শ্রমিকদের কাছে গ্রামীণ কর্মসংস্থান প্রকল্পই ছিল আয়ের প্রধান বিকল্প। অনিয়মিত বর্ষার কারণে খরিফ শস্যের চাষেও বড়সড় ঘাটতি দেখা গিয়েছে। কেন্দ্রীয় কৃষি মন্ত্রকের তথ্য অনুযায়ী, ৩১ জুলাই পর্যন্ত মাত্র ৮৯৪.২২ লক্ষ হেক্টর জমিতে খরিফ শস্যের চাষ হয়েছে, যা গত বছরের ৯২০.৭২ লক্ষ হেক্টরের তুলনায় অনেকটাই কম।

এই বিষয়ে সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে দেওয়া এক লিখিত প্রতিক্রিয়ায় গ্রামোন্নয়ন মন্ত্রকের এক শীর্ষ আধিকারিক জানিয়েছেন, গত ১ জুলাই থেকে সফলভাবে নতুন প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে। পুরোনো প্রকল্প থেকে নতুন প্রকল্পে রূপান্তরের প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ মসৃণ এবং প্রযুক্তি-নির্ভর ছিল। প্রতিটি রাজ্য তাদের নিজস্ব স্কিম ঘোষণা করেছে এবং প্রথম দিন থেকেই ডিজিটাল ইকোসিস্টেম কার্যকর করা হয়েছে। বাধাহীনভাবে কাজ পরিচালনার জন্য কেন্দ্রীয় সরকার ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষে ৯৫,৬৯২ কোটি টাকা বাজেট বরাদ্দ করেছে, যা এখনও পর্যন্ত যেকোনো গ্রামীণ কর্মসংস্থান কর্মসূচির জন্য সর্বোচ্চ রেকর্ড।

মন্ত্রকের আধিকারিক আরও জানিয়েছেন যে, কাজ চাওয়া ৯৮ শতাংশ গ্রামীণ পরিবারকেই কাজ দেওয়া হয়েছে। ফেস অথেন্টিকেশনের মাধ্যমে এনএমএমএস অ্যাপে উপস্থিতি নথিবদ্ধ করা হচ্ছে এবং ৯ লক্ষের বেশি সক্রিয় সাইটে ১.৩৩ কোটি শ্রমিককে তাদের চাহিদা অনুযায়ী কাজের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। অত্যন্ত ইতিবাচক দিক হলো, মোট তৈরি হওয়া শ্রম-দিবসের ৬৩ শতাংশই মহিলাদের দ্বারা সম্পন্ন হয়েছে, যা আইনিভাবে নির্ধারিত এক-তৃতীয়াংশের চেয়ে অনেকটাই বেশি। মন্ত্রক নিয়মিত প্রযুক্তিনির্ভর ড্যাশবোর্ড এবং আধিকারিকদের পরিদর্শনের মাধ্যমে কাজের মূল্যায়ন করছে।

নতুন ভিবি-জি র‍্যাম জি প্রকল্পে পুরোনো ১০০ দিনের পরিবর্তে একটি আর্থিক বছরে ১২৫ দিনের মজুরিভিত্তিক কর্মসংস্থানের গ্যারান্টি দেওয়া হয়েছে। তবে এর পাশাপাশি নতুন নিয়মে বীজ বপন ও ফসল কাটার মরশুমে স্থানীয় কৃষি-জলবায়ুর ওপর নির্ভর করে সর্বোচ্চ ৬০ দিন পর্যন্ত কাজ বন্ধ রাখারও আইনি সংস্থান রাখা হয়েছে। আধিকারিকদের একাংশের মতে, খরিফ মরশুমে চাষের কাজের সুবিধার জন্য কর্মসংস্থান প্রকল্পে এই বিরতি থাকাই শ্রম-দিবস কমে যাওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হতে পারে। যদিও বীজ বপনের মরশুমে ঠিক কতদিন কাজ বন্ধ রাখা হয়েছে, সেই বিষয়ে আলাদা কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য এখনও পর্যন্ত সরকারিভাবে প্রকাশ করা হয়নি।

বাংলাকাল-কে ফলো করুন

Facebook Comments Box

Discover more from বাংলাকাল

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Leave a Comment

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply