কলকাতা, ৩০ জুলাই: রাজ্যে বিপুল অঙ্কের নগদ ও সোনা উদ্ধারের ঘটনায় এবার চরম আইনি বিপাকে শাসকদলের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত প্রভাবশালী নেতা। বীরভূমের মল্লারপুরের চালকল ব্যবসায়ী তথা স্থানীয় নেতা মহম্মদ নিজামুদ্দিন ওরফে টুলু মণ্ডলের বিরুদ্ধে জামিনঅযোগ্য গ্রেফতারি পরোয়ানা (NBW) জারি করল আদালত। আত্মীয়ের বাড়ি থেকে ৫০ কোটি টাকারও বেশি মূল্যের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার পর থেকে আত্মগোপন করে থাকা এই নেতার নাগাল পেতে শেষমেশ কঠোর আইনি পদক্ষেপ করল তদন্তকারী সংস্থা।
পুলিশ ও তদন্তকারী সূত্রের খবর, সম্প্রতি টুলু মণ্ডলের আত্মীয় মিনার মণ্ডলের বাসভবনে এক বিশেষ অভিযান চালানো হয়। সেই তল্লাশি অভিযানে চোখ ছানাবড়া হয়ে যায় তদন্তকারীদের। মিনার মণ্ডলের বাড়ি থেকে উদ্ধার হয় নগদ ২৮.৫ কোটি টাকা এবং আনুমানিক ২২ কোটি টাকা মূল্যের বিপুল পরিমাণ সোনার গয়না ও বিস্কুট। সব মিলিয়ে যার বাজারমূল্য ৫০ কোটি টাকার সীমা অতিক্রম করে যায়। এই বিপুল পরিমাণ টাকার উৎস কী এবং এর পেছনে কোনো সংগঠিত আর্থিক অপরাধ বা পাচার চক্র যুক্ত রয়েছে কি না, তা নিয়ে জোর শোরগোল পড়ে যায় রাজ্যজুড়ে।
টাকা ও সোনা উদ্ধারের ঘটনায় ইতোমধ্যেই গ্রেফতার করা হয়েছে টুলুর আত্মীয় মিনার মণ্ডলকে। তাকে হেফাজতে নিয়ে টানা জিজ্ঞাসাবাদ চালাচ্ছেন তদন্তকারীরা। তবে ঘটনার মূল সূত্রধার বলে সন্দেহভাজন মহম্মদ নিজামুদ্দিন ওরফে টুলু মণ্ডল ঘটনার পর থেকেই পলাতক। বারংবার নোটিশ পাঠানো এবং সমন জারি করা সত্ত্বেও তিনি তদন্তকারীদের মুখোমুখি হননি বা কোনোপ্রকার সহযোগিতা করেননি।
অবশেষে তদন্তের স্বার্থে এবং অভিযুক্তকে দ্রুত হেফাজতে নিতে আদালতের দ্বারস্থ হয় রাজ্য পুলিশের তদন্তকারী দল। বিচারকের সামনে তদন্তকারীদের যুক্তি ছিল, তদন্তপ্রক্রিয়া এগিয়ে নিয়ে যাওয়া এবং উদ্ধার হওয়া এই বিপুল কালো টাকার আসল উৎস উন্মোচন করতে টুলু মণ্ডলকে সামনাসামনি রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করা অত্যন্ত জরুরি। পুলিশ লিখিতভাবে আদালতে একটি জামিনঅযোগ্য গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির আবেদন জানায়। উভয় পক্ষের প্রাথমিক তথ্য ও নথিপত্র পর্যালোচনা করার পর আদালত তদন্তকারী সংস্থার সেই আবেদন মঞ্জুর করে এবং টুলু মণ্ডলের বিরুদ্ধে জামিনঅযোগ্য পরোয়ানা জারির নির্দেশ প্রদান করে।
পুলিশ সূত্রে জানানো হয়েছে, এই বৃহৎ সম্পত্তি উদ্ধারের ঘটনার প্রেক্ষিতে নতুন দণ্ডসংহিতা অর্থাৎ ভারতীয় ন্যায় সংহিতার (BNS) একাধিক কড়া ধারায় মামলা রুজু করা হয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে—
- অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র: বেআইনিভাবে বিপুল সম্পত্তি আত্মসাৎ ও লুকানোর পরিকল্পনা।
- বিশ্বাসভঙ্গ ও প্রতারণা: আর্থিক তছরুপ ও আইনের চোখ ফাঁকি দেওয়া।
- সংগঠিত অপরাধ (Organised Crime): দলবদ্ধভাবে বেআইনি উপায়ে কোটি কোটি টাকা জমা করা ও কালো টাকা সাদা করার চক্রান্ত।
তদন্তকারীদের অনুমান, উদ্ধার হওয়া কোটি কোটি টাকার নগদ ও সোনা কোনো সাধারণ ব্যবসার লভ্যাংশ হতে পারে না। এর পেছনে বীরভূম ও সংলগ্ন অঞ্চলের একাধিক বেআইনি কারবার, বালু ও কয়লা পাচারের টাকা কিংবা কাটমানির বিপুল অঙ্ক গচ্ছিত রাখা হয়েছিল। মিনার মণ্ডলকে কেবল সামনের মুখ হিসেবে ব্যবহার করা হলেও এই মূল অর্থ এবং নেটওয়ার্কের শীর্ষে রয়েছেন খোদ টুলু মণ্ডল।
আদালতের তরফ থেকে জামিনঅযোগ্য পরোয়ানা হাতে পাওয়ার পর নড়েচড়ে বসেছে পুলিশ প্রশাসন। টুলু মণ্ডলের সম্ভাব্য সমস্ত ডেরা, আত্মীয়স্বজনের বাড়ি এবং গোপন আস্তানায় জোরদার তল্লাশি অভিযান শুরু করা হয়েছে। আন্তঃরাজ্য সীমান্তেও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে যাতে অভিযুক্ত কোনোভাবেই রাজ্য ছেড়ে পালিয়ে যেতে না পারেন।
তদন্তকারী আধিকারিকদের দাবি, টুলু মণ্ডল গ্রেফতার হলেই এই ৫০ কোটি টাকার পাহাড়ের নেপথ্যে থাকা অন্যান্য প্রভাবশালী মাথার নামও সামনে চলে আসবে। আপাতত আদালতের সবুজ সংকেত পাওয়ার পর অভিযুক্তকে গ্রেফতার করে আদালতে হাজির করাই পুলিশ প্রশাসনের প্রধান লক্ষ্য। ঘটনার তদন্ত প্রক্রিয়া দ্রুততার সাথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
বাংলাকাল-কে ফলো করুন
Discover more from বাংলাকাল
Subscribe to get the latest posts sent to your email.

