কলকাতা, ৩০ জুলাই: রাজ্য রাজনীতিতে যেন এক চরম উল্টো পুরাণ! একসময় রাজ্য পুলিশের জোড়া এফআইআর ও গ্রেফতারির হাত থেকে বাঁচতে যে ‘আইনি মডেল’ বা নজির খাড়া করেছিলেন শুভেন্দু অধিকারী, এবার ঠিক সেই পথ অনুসরণ করেই কলকাতা হাইকোর্টে বিরাট স্বস্তি পেলেন তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। বিরোধী শিবিরে যাওয়ার পর শুভেন্দু অধিকারীকে যে রক্ষাকবচ দিয়েছিল আদালত, সেই একই যুক্তিতে এবার অভিষেকের বিরুদ্ধেও আপাতত কোনো কড়া পদক্ষেপ বা গ্রেফতার করা যাবে না বলে সাফ জানিয়ে দিল আদালত। আগামী ৬ আগস্ট পর্যন্ত অভিষেকের জন্য এই আইনি ঢাল কার্যকর থাকবে।
বৃহস্পতিবার কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্যের এজলাসে ওঠে এই হাইপ্রোফাইল মামলাটি। গত মে মাসে রাজ্য রাজনীতিতে পটপরিবর্তন ও বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই তাঁর বিরুদ্ধে একের পর এক রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এফআইআর দায়ের করা হচ্ছে— এই অভিযোগ তুলে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিলেন ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ। তাঁর বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মোট ১১টি এফআইআর-এর তালিকা তুলে ধরে অভিযোগ করা হয়, কয়েক বছর আগের পুরনো ঘটনা টেনে এনে রাজনৈতিক চক্রান্তের মাধ্যমে তাঁকে ফাঁসানোর চেষ্টা চলছে।
এদিন আদালতে অভিষেকের পক্ষে সওয়াল করেন প্রবীণ আইনজীবী গোপাল শঙ্করনারায়ণন। তিনি আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণ করে জানান, ২০২০ সালের আমফান ঘূর্ণিঝড়ের ত্রাণ বন্টনে অনিয়ম এবং ২০১৭ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে বেআইনি খনি কারবারের মতো একাধিক পুরনো অভিযোগে হঠাৎ করে নতুন করে একের পর এক এফআইআর করা হচ্ছে। এত বছর ধরে কেন কোনো অভিযোগ দায়ের হয়নি, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, প্রাথমিক দৃষ্টিতে এসব অভিযোগে অভিষেকের কোনো সরাসরি ভূমিকা বা প্রমাণের উল্লেখ নেই।
অভিষেকের আইনি টিম আদালতের সামনে শুভেন্দু অধিকারীর পুরনো মামলার নজির হুবহু তুলে ধরে। আইনজীবী শঙ্করনারায়ণন মনে করিয়ে দেন, অতীতে তৃণমূল জমানায় তৎকালীন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী যখন একের পর এক মামলার মুখোমুখি হয়ে গ্রেফতারির আশঙ্কায় ছিলেন, তখন হাইকোর্টই তাঁকে সুরক্ষাকবচ দিয়েছিল। এমনকি আদালতের অনুমতি ছাড়া শুভেন্দুর বিরুদ্ধে নতুন এফআইআর না করারও নির্দেশ ছিল। সেই একই যুক্তিতে আজ অভিষেকের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক প্রতিহিংসামূলক পদক্ষেপ থেকে সুরক্ষা চাওয়া হয়।
আইনজীবী আরও যুক্তি দেন, তৎকালীন বিরোধী নেতা শুভেন্দু অধিকারী রক্ষাকবচ পেয়েছিলেন এবং বর্তমানে তিনি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। মুখ্যমন্ত্রী পদে আসীন শুভেন্দু অধিকারী নিজেই প্রকাশ্য ইঙ্গিত দিয়েছেন যে অভিষেকের বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় সংস্থা সিবিআইয়ের তদন্তাধীন মামলাগুলিও রাজ্য পুলিশের হাতে ফিরিয়ে আনা হবে। ফলে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় বর্তমানে চরম রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও আইনি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন।
অন্যদিকে, রাজ্য এবং রাজ্য সরকারের আইনজীবীদের তরফ থেকে এই অন্তর্বর্তী স্বস্তির আবেদনের তীব্র বিরোধিতা করা হয়। আদালতে রাজ্যের পক্ষে সওয়াল করতে গিয়ে কেন্দ্রের সলিসিটর জেনারেল (SG) তুষার মেহতা ও অতিরিক্ত সলিসিটর জেনারেল (ASG) এস ভি রাজু দাবি করেন, একজন আবেদনকারী একটিমাত্র আবেদন পেশ করে একসাথে এতগুলি এফআইআর বাতিল বা রক্ষাকবচ চাইতে পারেন না।
সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা সরাসরি অভিযোগ তোলেন, “অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় বিশেষ সুবিধা বা ‘স্পেশাল ট্রিটমেন্ট’ চাইছেন। সাধারণ নাগরিকদের মতো নিয়ম মেনে আগাম জামিনের আবেদন না করে তিনি সরাসরি এই অন্তর্বর্তী সুরক্ষার পথ বেছে নিয়েছেন।” তবে এই যুক্তির জবাবেই বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্য তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করে বলেন, “কিন্তু সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে এত অল্প সময়ের মধ্যে এত পরিমাণ এফআইআর তো সাধারণ অবস্থায় দেখা যায় না।”
অপরদিকে, এএসজি এস ভি রাজু সওয়ালে যুক্তি দেন, অতীতে তৃণমূল সরকার ক্ষমতায় থাকাকালীন অভিষেকের মতো অত্যন্ত প্রভাবশালী নেতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বা এফআইআর করতে পুলিশ হয়তো ইতস্তত করেছিল। তাই সময় পার হওয়ার অজুহাতে মামলা খারিজ বা অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশ দেওয়া অনুচিত।
সব পক্ষের সওয়াল-জবাব শোনার পর বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্য নির্দেশ দেন, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে ভবানীপুর, কালীতলা এবং বিষ্ণুপুর থানায় দায়ের হওয়া ৩টি নির্দিষ্ট এফআইআর-এ আগামী ৬ আগস্ট পর্যন্ত কোনো কড়া পদক্ষেপ বা গ্রেফতার করা যাবে না। তবে রিট পিটিশনে আপাতত কেবল এই ৩টি এফআইআর-এর বিস্তারিত নথি ও তথ্য থাকায়, বাকি মামলাগুলির ক্ষেত্র বিস্তৃত করা হয়নি।
একই সাথে, ডায়মন্ড হারবারের সাংসদের বিরুদ্ধে রাজ্যজুড়ে বর্তমানে মোট কতগুলি এফআইআর রুজু হয়ে রয়েছে, তার একটি পূর্ণাঙ্গ ও সুস্পষ্ট তালিকা আদালতে পেশ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে রাজ্যকে। তবে হাইকোর্ট স্পষ্ট করে দিয়েছে, ভবিষ্যতের নতুন কোনো সম্ভাব্য এফআইআর করার ক্ষেত্রে এখনই কোনো আগাম নিষেধাজ্ঞা জারি করা হচ্ছে না। আগামী ৬ আগস্ট ফের এই মামলার পরবর্তী শুনানি হবে।
বাংলাকাল-কে ফলো করুন
Discover more from বাংলাকাল
Subscribe to get the latest posts sent to your email.

