রাজ্যে প্রথম ডেডিকেটেড এনআইএ থানা নিউ টাউনে: এফআইআর থেকে তদন্ত, আর দৌড়াতে হবে না দিল্লি

রাজ্যে প্রথম ডেডিকেটেড এনআইএ থানা নিউ টাউনে: এফআইআর থেকে তদন্ত, আর দৌড়াতে হবে না দিল্লি

কলকাতা, ৩০ জুলাই: রাজ্যে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান ও বড়সড় অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের তদন্তে এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ করল প্রশাসন। রাজ্যজুড়ে জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা বা এনআইএ-র (National Investigation Agency) কাজকর্মকে আরও গতিশীল এবং সুসংহত করতে এবার আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হল পশ্চিমবঙ্গের প্রথম ডেডিকেটেড এনআইএ পুলিশ স্টেশন। কলকাতার উপনগরী নিউ টাউনের এনবিসিসি স্কোয়ারে (NBCC Square) তৈরি করা হয়েছে এই বিশেষ থানাটি।

প্রবীণ সাংবাদিক পিয়ালী মিত্রের দেওয়া রিপোর্ট অনুযায়ী, এত দিন পর্যন্ত এনআইএ-র কোনো মামলা রুজু করা বা বড় মাপের আইনি পদক্ষেপের জন্য দিল্লি সদর দপ্তরের নির্দেশের ওপর সরাসরি নির্ভর করতে হতো। অথবা প্রশাসনিক জটিলতায় সময় নষ্ট হতো। কিন্তু নিউ টাউনের এই নবগঠিত থানা চালু হওয়ার ফলে রাজ্যজুড়ে ঘটা এনআইএ আইনের অধীনস্থ যেকোনো তফসিলি অপরাধ বা জঙ্গি সংক্রান্ত মামলার এফআইআর (FIR) এখন থেকে স্থানীয়ভাবেই এই থানায় নথিভুক্ত করা সম্ভব হবে। সমগ্র পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের আইনি এক্তিয়ার বা জুরিসডিকশন থাকবে এই একটি থানার অধীনেই।

নতুন এই এনআইএ থানার সূচনাকে কেন্দ্র করে প্রশাসনিক ও আইনি মহলে ব্যাপক তৎপরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এত দিন পর্যন্ত যেকোনো বড় ধরনের বিস্ফোরণ, জঙ্গি মডিউলের উপস্থিতি বা দেশবিরোধী কার্যকলাপের তদন্তে নামতে গেলে কেন্দ্রীয় সংস্থার একাধিক আইনি অনুমোদনের পর্যায় অতিক্রম করতে হতো।

নিউ টাউনের এই থানা সরাসরি রাজ্যের যেকোনো প্রান্তের ঘটনার স্বতঃপ্রণোদিত অভিযোগ গ্রহণ বা স্থানীয়ভাবে এফআইআর দায়ের করার ক্ষমতা পাচ্ছে। এর ফলে গোটা পশ্চিমবঙ্গে জঙ্গি দমন শাখা বা এনআইএ অফিসারদের সরাসরি তদন্ত প্রক্রিয়া পরিচালনা করা, স্থানীয়ভাবে বাজেয়াপ্তকরণ অভিযান চালানো এবং অপরাধীদের রিমান্ডে নেওয়া বহুগুণ সহজ ও দ্রুত হবে। দিল্লি নির্ভরতা কমায় সার্বিক তদন্তের সময় অনেকটাই বেঁচে যাবে বলে মনে করছেন অভিজ্ঞ মহল।

এই বিশেষ থানা গঠনের বিষয়টি হঠাৎ করে হয়নি, এর পেছনে রয়েছে এক দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রেক্ষাপট। পূর্ববর্তী তৃণমূল কংগ্রেস (TMC) সরকারের আমলে একটি পৃথক ও পূর্ণাঙ্গ এনআইএ থানা তৈরির প্রস্তাব উত্থাপিত হয়েছিল এবং তা দীর্ঘ দিন ধরে প্রশাসনিক স্তরে অমূল্যায়ন বা সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় ঝুলে ছিল।

সম্প্রতি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ কলকাতায় এক উচ্চপর্যায়ের আইনশৃঙ্খলা পর্যালোচনা বৈঠকে যোগ দেন। সেই বৈঠকেই রাজ্যের সামগ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা পর্যালোচনা করে তিনি অতি দ্রুত ডেডিকেটেড এনআইএ থানা সচল করার স্পষ্ট নির্দেশ জারি করেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সেই নির্দেশের পরই লাল ফিতের ফাঁস কেটে প্রশাসনিক প্রক্রিয়া দ্রুত ত্বরান্বিত হয় এবং নিউ টাউনের এনবিসিসি স্কোয়ারে স্থান চিহ্নিত করে পূর্ণাঙ্গ থানা চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

গত ২৯ জুলাই, ২০২৪ তারিখে রাজ্য সরকারের তরফ থেকে একটি চূড়ান্ত সরকারি বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন রাজ্য সরকারের জারি করা এই বিজ্ঞপ্তিতে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে যে, জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা বা এনআইএ আইনের (NIA Act) বিধান অনুযায়ী এই নতুন থানাকে সন্ত্রাসবিরোধী তদন্ত এবং নির্ধারিত অন্যান্য গুরুতর অপরাধ অনুসন্ধানের পূর্ণ প্রশাসনিক ও আইনি ক্ষমতা দেওয়া হলো।

এই বিজ্ঞপ্তির ফলে নিউ টাউনের এই কেন্দ্রটি এখন থেকে একটি পূর্ণাঙ্গ থানার আইনি সুবিধা ও মর্যাদা ভোগ করবে। রাজ্য পুলিশ প্রশাসন এবং কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে এই কেন্দ্রটি মূল অনুঘটক হিসেবে কাজ করবে বলে প্রশাসনের একাংশের মত। সন্ত্রাসবাদ দমন, আন্তঃরাজ্য বা আন্তর্জাতিক অপরাধ নেটওয়ার্ক উন্মোচন এবং জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে এই সিদ্ধান্ত পশ্চিমবঙ্গের প্রশাসনিক ইতিহাসে এক তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায় হয়ে রইল।

বাংলাকাল-কে ফলো করুন

Facebook Comments Box

Discover more from বাংলাকাল

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Leave a Comment

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply