প্রাপ্তবয়স্কদের জীবনসঙ্গী বাছাইয়ের অধিকার মৌলিক, আন্তঃধর্মীয় দম্পতিকে নিরাপত্তা দিতে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশকে নির্দেশ কলকাতা হাইকোর্টের

প্রাপ্তবয়স্কদের জীবনসঙ্গী বাছাইয়ের অধিকার মৌলিক, আন্তঃধর্মীয় দম্পতিকে নিরাপত্তা দিতে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশকে নির্দেশ কলকাতা হাইকোর্টের

কলকাতা, ২৯ জুলাই: ধর্ম বা সামাজিক পরিচয় যাই হোক না কেন, যেকোনো দুজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির নিজের জীবনসঙ্গী স্বাধীনভাবে বেছে নেওয়ার অধিকার ভারতের সংবিধানের অধীনে একটি মৌলিক অধিকার (Fundamental Right)। একটি গুরুত্বপূর্ণ মামলার শুনানিতে এই বার্তা পুনরুল্লেখ করল কলকাতা হাইকোর্ট। ভিন্ন ধর্মের এক তরুণ-তরুণীর বিবাহ সুসম্পন্ন করতে এবং তাঁদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশকে স্পষ্ট নির্দেশনা প্রদান করেছে আদালতের একলব্য বেঞ্চ।

লাইভ ল-এর প্রতিবেদন সূত্রে জানা গিয়েছে, প্রাপ্তবয়স্ক এক আন্তঃধর্মীয় (Interfaith) দম্পতির দায়ের করা রিট পিটিশনের ভিত্তিতে মামলাটির শুনানি চলছিল কলকাতা হাইকোর্টে। আবেদনকারী যুগলের দাবি ছিল, ভিন্ন ধর্মের হওয়ার কারণে তাঁদের বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার সিদ্ধান্তকে পরিবার ও স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী গোষ্ঠীর তীব্র বিরোধিতার মুখে পড়তে হচ্ছে। এমনকি সামাজিক চাপ ও হুমকির কারণে তাঁদের জীবন ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতা বিপন্ন হয়ে পড়েছে বলে আদালতে অভিযোগ জানানো হয়।

মামলার শুনানি শেষে কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্য তাঁর গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণে জানান, ভারতীয় সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদে বর্ণিত জীবন ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার সুরক্ষার অধিকারের মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে নিজের ইচ্ছানুযায়ী সঙ্গী নির্বাচনের অধিকার। দুজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি যখন পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে বিয়ে করতে বা একসঙ্গে বসবাস করতে চান, তখন তাতে বাধা দেওয়ার আইনি বা নৈতিক অধিকার পরিবার কিংবা সমাজের অন্য কারও নেই।

আদালত পুলিশ প্রশাসনকে নির্দেশ দিয়েছে যে, উক্ত দম্পতি যাতে কোনো ধরনের ভয়ভীতি, সামাজিক হেনস্থা বা আক্রমণের শিকার না হন, তা নিশ্চিত করতে অবিলম্বে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা কভার প্রদান করতে হবে। সংশ্লিষ্ট স্থানীয় পুলিশ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে যাতে এই যুগলের বিবাহ প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ ও ঝামেলামুক্ত পরিবেশে সুসম্পন্ন হয়।

হাইকোর্টের বেঞ্চ আরও স্পষ্ট করেছে যে, কোনো পরিবার বা গোষ্ঠী যদি আইনের তোয়াক্কা না করে যুগলকে হুমকি প্রদান করে বা তাঁদের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের চেষ্টা চালায়, তবে রাজ্য পুলিশ প্রশাসনকে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। ব্যক্তিগত স্বাধীনতার ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত করার কোনো অপচেষ্টা সহ্য করা হবে না বলে বার্তা দেওয়া হয়েছে।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতে বিভিন্ন সময়ে আন্তঃধর্মীয় বিবাহকে কেন্দ্র করে সামাজিক টানাপোড়েন ও বিরোধের নানা ঘটনা সামনে এসেছে। অনেক ক্ষেত্রে নবদম্পতিদের পারিবারিক রোষের মুখে পড়ে চরম নিরাপত্তার অভাব ভোগ করতে হয়। এই প্রেক্ষাপটে কলকাতা হাইকোর্টের এই রায় ও নির্দেশ প্রাপ্তবয়স্কদের সাংবিধানিক অধিকারকে রক্ষা করার ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও শক্ত বার্তা প্রদান করল।

আদালতের এই পর্যবেক্ষণ স্পষ্ট করে দেয় যে, ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও সংবিধান প্রদত্ত জীবনসঙ্গী নির্বাচনের অধিকার সর্বদা সামাজিক গোঁড়ামি বা পারিবারিক আপত্তির উর্ধ্বে অবস্থান করে।

বাংলাকাল-কে ফলো করুন।

Facebook Comments Box

Discover more from বাংলাকাল

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Leave a Comment

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply