কলকাতা, ৫ আগস্ট:তিলোত্তমার পরিবহন ব্যবস্থার মানচিত্রে জোকা-এসপ্ল্যানেড মেট্রো প্রকল্প বা পার্পল লাইন এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। তবে দক্ষিণ কলকাতার সঙ্গে শহরের প্রাণকেন্দ্র ধর্মতলাকে দ্রুতগামী রেল যোগাযোগের মাধ্যমে যুক্ত করার এই উচ্চাকাঙ্ক্ষী উদ্যোগ ফের এক গভীর জটিলতার মুখে পড়েছে। ময়দান অঞ্চলের বিখ্যাত বিধান মার্কেট বা ডক্টর বি সি রায় মার্কেট স্থানান্তরের প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া অচলাবস্থা কাটছেই না। রেল বিকাশ নিগম লিমিটেড বা আরভিএনএল-এর পক্ষ থেকে ব্যবসায়ীদের জন্য বিকল্প পুনর্বাসনের বন্দোবস্ত করা সত্ত্বেও নিজেদের পুরনো স্থান ছাড়তে নারাজ সিংহভাগ ব্যবসায়ী। ফলে থমকে রয়েছে এসপ্ল্যানেড ভূগর্ভস্থ মেট্রো স্টেশন এবং সুরঙ্গ নির্মাণের গুরুত্বপূর্ণ কাজ।
কলকাতার ক্রীড়াপ্রেমী ও সাধারণ মানুষের কাছে ময়দান মার্কেট নামে পরিচিত এই বিধান মার্কেট বহু দশকের পুরনো। খেলাধুলোর যাবতীয় সরঞ্জাম, পোশাক এবং ট্রফি কেনাকাটার অন্যতম প্রধান হাব এটি। তবে পার্পল লাইনের মোমিনপুর থেকে এসপ্ল্যানেড পর্যন্ত বিস্তৃত ভূগর্ভস্থ অংশের কাজ শেষ করতে এই বাজারটির বর্তমান অবস্থান খালি করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। মেট্রো কর্তৃপক্ষের পরিকল্পনা অনুযায়ী, কার্জন পার্ক সংলগ্ন এলাকায় রানি রাসমণি অ্যাভিনিউ এবং সিধো-কানহু ডাহারের মধ্যবর্তী স্থানে একটি আধুনিক দোতলা অস্থায়ী পরিকাঠামো গড়ে তুলে সেখানেই এই বাজারের প্রায় সাড়ে পাঁচশো ব্যবসায়ীকে সাময়িকভাবে স্থানান্তরিত করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। উক্ত স্থানে পানীয় জল, বিদ্যুত, অগ্নি নির্বাপক ব্যবস্থা এবং শৌচাগারের সুবিধাসমেত একটি সুসংহত ব্যবস্থার প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছে।
তা সত্ত্বেও স্থানান্তরে কেন এত বড় অমত ব্যবসায়ীদের? বাজার কমিটির প্রতিনিধি এবং ব্যবসায়ীদের দাবি, মূল সমস্যাটি কেবল সাময়িক স্থানান্তরের নয়, বরং তাঁদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার। ব্যবসায়ীদের মূল আশঙ্কা, একবার বর্তমানে দখল করা স্থান ছেড়ে কার্জন পার্কের অস্থায়ী কাঠামোয় চলে গেলে মেট্রোর নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পর তাঁরা পুনরায় নিজেদের পূর্বের নির্ধারিত স্থানে ফিরে আসতে পারবেন কি না, সে বিষয়ে কোনো স্পষ্ট লিখিত প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে না। সেনা নিয়ন্ত্রিত জমিতে অবস্থিত এই ঐতিহ্যবাহী বাজারে যুগের পর যুগ ব্যবসা চালিয়ে আসার পর আইনি নথিপত্রের অভাব ও ভূমির স্বত্বাধিকার নিয়ে ধোঁয়াশার কারণে দীর্ঘমেয়াদী রুজিরুটি হারানোর ভয়ে ভুগছেন ছোট-বড় সমস্ত দোকানি।
পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের একাংশের মতে, কার্জন পার্কের প্রস্তাবিত অস্থায়ী স্থানটিতে ক্রেতাদের যাতায়াতের সুযোগ তুলনামূলকভাবে কঠিন হতে পারে, যা তাঁদের দৈনন্দিন বিকিকিনিতে মারাত্মক প্রভাব ফেলবে। বিশেষ করে উৎসবের মরসুম বা খেলার দিনগুলোতে যে ব্যবসায়িক স্বাভাবিকতা থাকে, নতুন ও সাময়িক জায়গায় তা বজায় রাখা সম্ভব হবে না বলেই তাঁদের ধারণা। স্থানান্তরের নির্দিষ্ট মেয়াদ কতদিন হবে এবং নির্মাণ চলাকালীন আর্থিক ক্ষতির কোনো ক্ষতিপূরণ প্রদান করা হবে কি না, সেই সংক্রান্ত কোনো সুনির্দিষ্ট নির্দেশিকা রেল কিংবা মেট্রো কর্তৃপক্ষের থেকে না আসায় ক্ষোভ আরও ঘনীভূত হয়েছে।
অন্যদিকে, প্রতিরক্ষা মন্ত্রক, ভারতীয় সেনাবাহিনী এবং রেল মন্ত্রকের যৌথ আলোচনায় কার্জন পার্কের অস্থায়ী পরিকাঠামো নির্মাণের অনুমতি মিললেও বাস্তব জমিতে তার বাস্তবায়ন বেশ ধীরগতিতে এগোচ্ছে। ঠিকাদারি সংস্থা ও আরভিএনএল আগেই স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে জোকা-এসপ্ল্যানেড মেট্রো সংযোগ চালু করতে হলে ময়দান মার্কেট সংলগ্ন স্থানটি অবিলম্বে খালি করে জট মুক্ত করা প্রয়োজন। জমি হস্তান্তরে এই দীর্ঘসূত্রতার কারণে প্রকল্পটির ব্যয় যেমন বৃদ্ধি পাচ্ছে, তেমনই দক্ষিণ কলকাতার বিপুল সংখ্যক ট্রেনযাত্রীর দ্রুত ধর্মতলা পৌঁছানোর দীর্ঘ প্রতীক্ষিত স্বপ্ন ক্রমশ পিছিয়ে যাচ্ছে। প্রশাসন, মেট্রো কর্তৃপক্ষ ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে অবিলম্বে ত্রিপক্ষীয় বৈঠক ডেকে সমস্যার সম্মানজনক সমাধানসূত্র বের না করা হলে জট কাটার কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না।
Discover more from বাংলাকাল
Subscribe to get the latest posts sent to your email.

