গাজা,১ ফেব্রুয়ারি : ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় চলমান যুদ্ধবিরতির মধ্যেই ইসরায়েলি বাহিনীর একাধিক বিমান হামলায় অন্তত ৩১ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ছয়জন শিশু রয়েছে এবং বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্যও এই হামলার শিকার হয়েছেন। এই ঘটনা ঘটেছে ২০২৬ সালের ৩১ জানুয়ারি শনিবার ভোর থেকে, যা অক্টোবর ২০২৫-এ কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তির পর সবচেয়ে মারাত্মক দিনগুলির একটি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
হামলাগুলি গাজা সিটি এবং খান ইউনিসে কেন্দ্রীভূত ছিল, যার মধ্যে তাঁবু শিবির, আবাসিক অ্যাপার্টমেন্ট এবং একটি পুলিশ স্টেশন লক্ষ্য করে আঘাত হানা হয়েছে। এই হামলার ঠিক পরের দিন, অর্থাৎ ১ ফেব্রুয়ারি রবিবার, রাফাহ সীমান্ত ক্রসিং সীমিত ভাবে পুনরায় খোলার কথা রয়েছে, যা ২০২৪ সালের মে মাসের পর প্রথমবারের মতো এমন ঘটনা এবং যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় পর্যায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং হাসপাতাল সূত্রের বরাত দিয়ে আল জাজিরা জানিয়েছে, শনিবার সকাল থেকে একাধিক হামলায় মোট ৩১ জনের মৃত্যু হয়েছে। খান ইউনিসের আল-মাওয়াসি এলাকায় বাস্তুচ্যুত মানুষের তাঁবু শিবিরে একটি বিমান হামলায় অন্তত সাতজন নিহত হন, যাদের মধ্যে একটি পরিবারের তিন শিশু এবং তাদের দাদা রয়েছেন। নাসের হাসপাতালে মৃতদেহ নিয়ে আসা হয়েছে এবং হামলায় আগুন লেগে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়েছে। গাজা সিটির রেমাল এলাকায় একটি আবাসিক অ্যাপার্টমেন্ট ভবনে হামলায় পাঁচজন নিহত হন—তিন শিশু, তাদের খালা এবং দাদি।
শিফা হাসপাতালের পরিচালক মোহাম্মদ আবু সেলমিয়া জানিয়েছেন, গাজা সিটির শেখ রাদওয়ান এলাকায় একটি পুলিশ স্টেশনে হামলায় অন্তত ১৪ জন নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে পুলিশ অফিসার, চারজন মহিলা পুলিশ সদস্য এবং কয়েকজন বন্দি রয়েছেন। গাজার সিভিল ডিফেন্স এজেন্সি জানিয়েছে, নিহতদের মধ্যে শিশু ও নারীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য এবং কয়েকটি পরিবার সম্পূর্ণভাবে বিধ্বস্ত হয়েছে।ইসরায়েলি সেনাবাহিনী (আইডিএফ) এই হামলাগুলিকে যুদ্ধবিরতি চুক্তির লঙ্ঘনের প্রতিক্রিয়া হিসেবে বর্ণনা করেছে। তারা দাবি করেছে, শুক্রবার রাফাহতে একটি টানেল থেকে আটজন ফিলিস্তিনি যোদ্ধা বেরিয়ে আসার ঘটনা এবং অন্যান্য লঙ্ঘনের পরিপ্রেক্ষিতে এই হামলা চালানো হয়েছে।
আইডিএফ জানিয়েছে, হামাস ও ইসলামিক জিহাদের কয়েকজন কমান্ডার এবং অবকাঠামো লক্ষ্য করে আঘাত হানা হয়েছে। অন্যদিকে, হামাস এই হামলাগুলিকে “যুদ্ধবিরতির স্পষ্ট ও নতুন লঙ্ঘন” বলে অভিহিত করেছে এবং যুক্তরাষ্ট্রসহ মধ্যস্থতাকারী দেশগুলির কাছে ইসরায়েলকে থামানোর আহ্বান জানিয়েছে। হামাসের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এই হামলা নিরীহ নাগরিকদের বিরুদ্ধে “নৃশংস অপরাধ” এবং এটি অঞ্চলের শান্তি প্রচেষ্টাকে বিপন্ন করছে। মিশর ও কাতারও ইসরায়েলের এই পদক্ষেপের নিন্দা করে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছে।
যুদ্ধবিরতি চুক্তি ২০২৫ সালের অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় কার্যকর হয়েছে, যার দ্বিতীয় পর্যায়ে রাফাহ ক্রসিং পুনরায় খোলা, গাজার নিরস্ত্রীকরণ এবং পুনর্গঠনের জন্য নতুন প্রশাসন গঠনের বিষয় রয়েছে। কিন্তু চুক্তি কার্যকর হওয়ার পর থেকে প্রায় প্রতিদিনই লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুসারে, যুদ্ধবিরতির পর থেকে এ পর্যন্ত ৫০০-এর বেশি ফিলিস্তিনি ইসরায়েলি হামলায় নিহত হয়েছেন। সমগ্র যুদ্ধে (২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে) মোট নিহতের সংখ্যা ৭১,০০০-এরও বেশি। রাফাহ ক্রসিং খোলার ফলে চিকিৎসা, মানবিক সাহায্য এবং বাস্তুচ্যুত মানুষের চলাচল সহজ হবে বলে আশা করা হচ্ছিল, কিন্তু এই ধরনের হামলা পরিস্থিতিকে আরও অস্থির করে তুলেছে। গাজার বাসিন্দারা বলছেন, যুদ্ধবিরতি ও যুদ্ধের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই—প্রতিদিনই মৃত্যু ও ধ্বংস অব্যাহত রয়েছে।এই ঘটনা গাজার মানবিক সংকটকে আরও গভীর করেছে। বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলি তাঁবুতে আশ্রয় নিয়ে কোনোমতে বেঁচে আছে, শিশুরা খাদ্য ও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে এখন প্রশ্ন উঠেছে—যুদ্ধবিরতি কি সত্যিই কার্যকর হচ্ছে, নাকি এটি শুধুমাত্র কাগজে-কলমে? গাজার জনগণের জন্য স্থায়ী শান্তি ও নিরাপত্তা এখনও দূরের স্বপ্ন।
Discover more from বাংলাকাল
Subscribe to get the latest posts sent to your email.

