দুবাই/দোহা, ২৪ জুলাই: লোহিত সাগরে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা ও আঞ্চলিক সংঘাত বৃদ্ধির নেপথ্যে ইরান কীভাবে সরাসরি ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের ইন্ধন জোগাচ্ছে, সে সংক্রান্ত এক চাঞ্চল্যকর এক্সক্লুসিভ রিপোর্ট প্রকাশ করেছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। একাধিক আঞ্চলিক সামরিক ও নিরাপত্তা সূত্রের বরাতে জানা গেছে, তেহরান অত্যন্ত গোপনে নিজস্ব বিমানে করে ইসলামিক রিভোল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (IRGC) শীর্ষ কমান্ডারদের পাশাপাশি অত্যাধুনিক মিসাইল ও ড্রোন তৈরির যন্ত্রাংশ সরাসরি ইয়েমেনে হুতিদের ঘাঁটিতে পাঠিয়েছে। পশ্চিম এশিয়ার উত্তপ্ত ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এই তথ্য প্রকাশ পাওয়ার পর আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও সামরিক মহলে নতুন করে তীব্র আলোড়ন তৈরি হয়েছে।
রয়টার্সের আন্তর্জাতিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, আন্তর্জাতিক নজরদারি এড়াতে ইরান সরাসরি কোনো সামরিক বিমান ব্যবহার করেনি। তার বদলে বেসামরিক এবং ত্রাণবাহী বিমানের আড়ালে ইয়েমেনের রাজধানী সানা ও উপকূলীয় অঞ্চলে এই গোপন চালান পাঠানো হয়েছে। ইরানের শীর্ষ সামরিক বাহিনী আইআরজিসি-র কিউডস ফোর্সের (Quds Force) একাধিক অভিজ্ঞ কমান্ডারের পাশাপাশি ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র বিশেষজ্ঞ প্রকোশলীরা সরাসরি এই ফ্লাইটে ইয়েমেনে পৌঁছান।
নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, হুতিদের নিজস্ব কোনো উচ্চপ্রযুক্তির ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন তৈরির প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এতদিন ছিল না। ফলে আইআরজিসি কমান্ডারদের মাঠপর্যায়ে উপস্থিতি এবং প্রযুক্তিগত সহায়তার কারণেই হুতিরা লোহিত সাগর ও সংলগ্ন আন্তর্জাতিক শিপিং লেনে শত শত কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুতে নিখুঁত আঘাত হানতে সক্ষম হচ্ছে।
সূত্রমতে, বিমানে করে পাঠানো সরঞ্জামের মধ্যে মূলত দূরপাল্লার অ্যান্টি-শিপ মিসাইলের নির্দেশনা ব্যবস্থা (Guidance System), ড্রোনের অত্যন্ত সংবেদনশীল ইলেকট্রনিক পার্টস এবং কঠিন জ্বালানিচালিত রকেটের যন্ত্রাংশ অন্তর্ভুক্ত ছিল। সমুদ্রপথে জাতিসংঘের কঠোর অবরোধ ও নজরদারি চালু থাকার কারণে ইরান সরাসরি নৌপথে বিশাল মিসাইল পাঠানো কঠিন দেখে এই নতুন বিমান পথ বেছে নেয়।
ইয়েমেনের হুথি সরকারের প্রধান বিমানবন্দরগুলোর নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে থাকায়, ত্রাণ সামগ্রী বা বেসামরিক যাত্রীদের ছদ্মবেশে সামরিক চালানগুলো নামানো বেশ সহজ হয়েছে বলে রয়টার্সের প্রতিবেদনে জানা গেছে। এই প্রযুক্তিগত সহায়তার ফলেই ইয়েমেনি বিদ্রোহীরা খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে নিজেদের সাধারণ রকেটগুলোকে গাইড পিনপয়েন্ট মিসাইলে রূপান্তর করতে পেরেছে।
লোহিত সাগরে হুথি বিদ্রোহীদের ক্রমাগত ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। সুয়েজ খাল ব্যবহারকারী আন্তর্জাতিক শিপিং লাইনগুলো তাদের চলাচলের পথ পরিবর্তন করতে বাধ্য হচ্ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে বিশ্ব অর্থনীতিতে।
ওয়াশিংটন ও লোহিত সাগরে থাকা মার্কিন নেতৃত্বাধীন যৌথ নৌসেনা বাহিনী বারবার অভিযোগ করে এসেছে যে হুথি আক্রমণগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এর পেছনে রয়েছে তেহরানের সরাসরি নির্দেশনা ও সামরিক সহায়তা। যদিও ইরান বারবার হুথি বিদ্রোহীদের সামরিক বা প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়ার অভিযোগ প্রকাশ্যে অস্বীকার করে এসেছে, তবে রয়টার্সের এই এক্সক্লুসিভ তথ্য সেই দাবিকে বড়সড় প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাল।
আন্তর্জাতিক সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ইয়েমেনে আইআরজিসি কমান্ডো এবং নিখুঁত মিসাইল প্রযুক্তির অবাধ সরবরাহ মধ্যপ্রাচ্যে বহুমাত্রিক যুদ্ধের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। যদি ইরান এই গোপন সরবরাহ অব্যাহত রাখে, তবে কেবল লোহিত সাগর নয়, বরং আশেপাশের অন্য প্রতিবেশী দেশ ও তাদের অর্থনৈতিক অবকাঠামোও হুথিদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে। রয়টার্সের সূত্রগুলো ইঙ্গিত দিয়েছে যে, আন্তর্জাতিক চাপ সত্ত্বেও তেহরান তাদের এই প্রক্সি বা ছায়াযুদ্ধে অর্থ ও আধুনিক সামরিক প্রযুক্তি বিনিয়োগ বন্ধ করার কোনো লক্ষণ দেখাচ্ছে না।
বাংলাকাল-কে ফলো করুন
Discover more from বাংলাকাল
Subscribe to get the latest posts sent to your email.

