তিরুঅনন্তপুরম, ১ আগস্ট: কাজের উদ্দেশ্যে বিদেশে গিয়ে প্রতারণার শিকার হয়ে সাইবার অপরাধ বা অনলাইন স্ক্যামের চক্রে জড়িয়ে পড়ার এক মর্মান্তিক ঘটনা সামনে এসেছে। দক্ষিণ ভারতের জনপ্রিয় সংবাদমাধ্যম ‘দ্য নিউজ মিনিট’ (The News Minute)-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, কম্বোডিয়ায় সাইবার স্ক্যামে জড়িত থাকার অভিযোগে ১৮ জন কেরল ও ২ জন তামিলনাড়ুর বাসিন্দা সহ মোট ২০ জন ভারতীয় নাগরিককে গ্রেপ্তার করে জেলে বন্দি করে রাখা হয়েছে। গত ২৬ জুন ২০২৬ থেকে তাঁরা কম্বোডিয়ার বান্টি মিঞ্চে (Banteay Meanchey) প্রোভিন্সিয়াল প্রিজনে বিচারে অপেক্ষারত অবস্থায় আটক রয়েছেন। দীর্ঘদিন ধরে সঠিক কোনো আইনি তথ্য, মামলার নম্বর বা নির্দিষ্ট চার্জশিটের বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা না থাকায় চরম অনিশ্চয়তা ও দুশ্চিন্তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন আটক ব্যক্তিদের পরিবার।
সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথোপকথনে ভুক্তভোগীদের পরিবারগুলি তাঁদের স্বজনদের প্রতারিত হয়ে কম্বোডিয়ায় পৌঁছে যাওয়ার ভয়াবহ অভিজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। কেরলের এক সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং গ্র্যাজুয়েট তরুণ মেহফিলের (নাম পরিবর্তিত) বাবা জানান, জাপানে চাকরি দেওয়ার কথা বলে এক পরিচিত ব্যক্তি তাঁর ছেলেকে প্রথমে ব্যাংকক এবং সেখান থেকে কৌশলে কম্বোডিয়ায় নিয়ে যায়। পরে জানা যায়, কম্বোডিয়ায় একটি হোস্টেলে তাঁকে বন্দি রেখে কেবল কম্পিউটারের মাধ্যমে নির্দিষ্ট কিছু কাজ করতে বাধ্য করা হতো এবং বাইরে বের হওয়ার কোনো অনুমতি দেওয়া হতো না। মেহফিল নিজেই জানতেন না যে তিনি কম্বোডিয়ায় রয়েছেন।
একইভাবে আটক হওয়া অন্য বেশ কয়েকজন ভারতীয় নাগরিকের পরিবার জানিয়েছে, কেউ ভিয়েতনামে ক্যাফেতে কাজ করতে গিয়ে বা সফটওয়্যার সংস্থায় চাকরির জন্য পাড়ি দিয়ে শেষ পর্যন্ত বিভিন্ন অসৎ চক্রের মাধ্যমে কম্বোডিয়ার স্ক্যাম সেন্টারে পৌঁছে যান। আটক ২০ জনের মধ্যে ১৬ জন পুরুষ এবং ৪ জন নারী রয়েছেন। তাঁদের বেশিরভাগকেই প্রতারণামূলক অনলাইন কাজকর্ম বা সাইবার জালিয়াতিতে বলপূর্বক অথবা অজান্তে ব্যবহার করা হয়েছিল বলে দাবি পরিবারের।
কম্বোডিয়ার পইপেট (Poipet) শহরের স্থানীয় পুলিশ গত ২৬ জুনে পরিচালিত অভিযানের সময় এই ভারতীয়দের আটক করে। সেখান থেকে তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়ার জন্য তাঁদের বান্টি মিঞ্চে প্রাদেশিক কারাগারে স্থানান্তরিত করা হয়। কম্বোডিয়া ভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ‘খমের টাইমস’ (Khmer Times)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে কম্বোডিয়া কর্তৃপক্ষ প্রায় ৩,০০০টি স্থানে তল্লাশি চালিয়ে অনলাইন স্ক্যামে জড়িত সন্দেহে বিভিন্ন দেশের প্রায় ২,৩০০ জন বিদেশী নাগরিককে আটক করেছে।
এদিকে, ভারতে থাকা স্বজনদের আবেদনের পর কম্বোডিয়ায় অবস্থিত ভারতীয় দূতাবাস বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। দূতাবাসের এক কনস্যুলার অফিসার গত ২১ জুলাই কারাগারে গিয়ে আটক ভারতীয়দের সাথে এবং জেল কর্তৃপক্ষের সাথে সরাসরি কথা বলেন। তবে মামলার সুনির্দিষ্ট ধারা, বিচার শুরুর দিনক্ষণ কিংবা জামিনের আইনি প্রক্রিয়া নিয়ে পর্যাপ্ত তথ্য না পাওয়ায় স্বজনদের উদ্বেগ কমছে না।
আটক ভারতীয়দের পরিবারগুলি ইতিপূর্বে কেরালা ও তামিলনাড়ুর সাংসদ, বিধায়ক এবং কেন্দ্রীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রকের কাছে লিখিত আবেদন জানিয়েছেন। চিঠিতে পরিবারগুলির স্পষ্ট বক্তব্য, তারা কোনো বেআইনি সুবিধা বা বিশেষ ছাড় চাইছেন না; বরং তাঁদের দাবি, আদালতের মাধ্যম যেন প্রতিটি ব্যক্তির স্বতন্ত্র ভূমিকা খতিয়ে দেখা হয়। মানব পাচারের শিকার হয়ে জোরপূর্বক সাইবার ক্রাইমে যুক্ত হওয়া নির্দোষ তরুণদের আইনি সহায়তা দিয়ে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য ভারত সরকারের জরুরি হস্তক্ষেপ চেয়েছে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো।
বাংলাকাল-কে ফলো করুন
Discover more from বাংলাকাল
Subscribe to get the latest posts sent to your email.

