কুলগাম জঙ্গি হানায় নিহত দুই শ্রমিক: ১০ লাখ টাকা করে আর্থিক সাহায্য ঘোষণা জম্মু ও কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লার

কুলগাম জঙ্গি হানায় নিহত দুই শ্রমিক: ১০ লাখ টাকা করে আর্থিক সাহায্য ঘোষণা জম্মু ও কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লার

শ্রীনগর, ১ আগস্ট: জম্মু ও কাশ্মীরের কুলগাম জেলায় সন্ত্রাসী হামলায় প্রাণ হারানো দুই পরিযায়ী শ্রমিকের পরিবারের জন্য ১০ লাখ টাকা করে এককালীন আর্থিক অনুদান (Ex-Gratia) প্রদানের ঘোষণা দিলেন মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লা। শনিবার সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এই ক্ষতিপূরণের কথা জানানো হয়। শুক্রবার রাতে দক্ষিণ কাশ্মীরের কুলগামের কেলাম এলাকায় একটি ইটভাটায় কর্মরত ছত্তিশগড়ের দুই পরিযায়ী শ্রমিকের ওপর এলোপাথাড়ি গুলি চালায় অজ্ঞাতপরিচয় সন্ত্রাসবাদীরা। এই ঘটনায় দু’জনেরই মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটে। নিরীহ ও নিরস্ত্র নাগরিকদের ওপর এমন বর্বরোচিত জঙ্গি হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার গভীর সন্ধ্যায় কুলগাম জেলার কেলাম এলাকায় অবস্থিত একটি ইটভাটায় কাজ করছিলেন পরিযায়ী শ্রমিকের দলটি। সেই সময় অতর্কিতে সেখানে চড়াও হয় বন্দুকধারী সন্ত্রাসবাদীরা এবং তাদের লক্ষ্য করে গুলি চালাতে শুরু করে। গুলিবর্ষণে গুরুতর আহত হন ছত্তিশগড় থেকে কাজ করতে আসা দুই যুবক— ২৪ বছর বয়সী দীপক রাত্রে এবং ২৮ বছর বয়সী ভূপেন্দ্র ভৈনা।

দীপক পাত্রকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পথেই তাঁর মৃত্যু হয়। অন্যদিকে, আশঙ্কাজনক অবস্থায় ভূপেন্দ্রকে প্রথমে অনন্তনাগের সরকারি মেডিকেল কলেজে ভর্তি করা হয়েছিল, তবে অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাঁকে রাতারাতি শ্রীনগরের ‘শের-ই-কাশ্মীর ইনস্টিটিউট অফ মেডিকেল সায়েন্সেস’ (SKIMS)-এ স্থানান্তরিত করা হয়, যেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনিও শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

এই বর্বরোচিত ঘটনার পর শনিবার সকালে জম্মু ও কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রীর কার্যালয়ের (CMO) পক্ষ থেকে সমাজমাধ্যম ‘এক্স’-এ (X) একটি বিবৃতি প্রকাশ করা হয়। পোস্টে উল্লেখ করা হয়, মুখ্যমন্ত্রী কুলগামে দুই শ্রমিকের এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের তীব্র ভাষায় নিন্দা জানিয়েছেন এবং নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করেছেন।

মুখ্যমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছেন যে, ‘চিফ মিনিস্টার্স রিলিফ ফান্ড’ (CMRF) থেকে নিহতদের পরিবারপিছু ১০ লাখ টাকা করে সাহায্য দেওয়া হবে। কোনো অর্থই স্বজন হারানোর বেদনা মেটাতে পারে না, তবে এই কঠিন সময়ে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়াতেই প্রশাসন এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানান মুখ্যমন্ত্রী। এর পাশাপাশি, নিহত শ্রমিকদের মরদেহ যাতে পূর্ণ মর্যাদার সঙ্গে তাঁদের নিজ রাজ্য ছত্তিশগড়ে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়, তার জন্য প্রশাসনিক স্তরে সমস্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

নিহত দুই পরিযায়ী শ্রমিকের করুণ পরিস্থিতি ও পারিবারিক প্রেক্ষাপট কাশ্মীর উপত্যকার এই ট্র্যাজেডিকে আরও বেদনাদায়ক করে তুলেছে। ২৪ বছর বয়সী দীপক রাত্রে ছত্তিশগড়ের শক্তিশাল জেলার বুন্দেলি গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন। তিনি ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী সদস্য। তাঁর ওপর নির্ভরশীল ছিলেন বৃদ্ধা মা, শারীরিক প্রতিবন্ধী এক ছোট ভাই, স্ত্রী এবং মাত্র চার মাসের একটি শিশুসন্তান। জীবিকার তাগিদে ভালো ভবিষ্যতের আশায় আট মাস আগে স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে কুলগামের ওই ইটভাটায় কাজে এসেছিলেন দীপক।

অন্যদিকে, ২৮ বছর বয়সী ভূপেন্দ্র ভৈনা ছত্তিশগড়ের সারানগড়-বিলাইগড় জেলার ছুঁইয়া গ্রামের বাসিন্দা। তিনিও মাস তিনেক আগে স্ত্রী সহ উপত্যকায় পাড়ি দিয়েছিলেন। তাঁদের চার বছরের একমাত্র সন্তানকে বাড়িতে ঠাকুমা ও পিসির কাছে রেখে কাজের উদ্দেশ্যে এসেছিলেন এই দম্পতি। পরিযায়ী শ্রমিকদের ওপর এভাবে হঠাৎ গুলি চালানোর পর এলাকায় তীব্র চাঞ্চল্য ও আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে।

এই কাপুরুষোচিত হামলার খবর ছড়িয়ে পড়তেই রাজ্য ও জাতীয় রাজনীতিতে নিন্দার ঝড় উঠেছে। ছত্তিশগড়ের মুখ্যমন্ত্রী বিষ্ণু দেব সাই এই ঘটনাকে চরম “কাপুরুষোচিত” বলে চিহ্নিত করেছেন। তিনি জানান যে, তাঁর সরকার জম্মু ও কাশ্মীর প্রশাসনের সঙ্গে প্রতিনিয়ত যোগাযোগ রাখছে, যাতে দ্রুত মরদেহগুলি স্বগ্রামে এনে পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া যায়।

হামলার পরপরই পুরো কুলগাম এলাকা ঘিরে ফেলেছে সেনাবাহিনী, সিআরপিএফ (CRPF) এবং জম্মু-কাশ্মীর পুলিশের যৌথ বাহিনী। সন্ত্রাসবাদীদের সন্ধানে সংলগ্ন বনাঞ্চল ও সম্ভাব্য আস্তানাগুলিতে জোরদার তল্লাশি অভিযান চালানো হচ্ছে। বিগত কিছু সময়ে উপত্যকায় বহিরাগত ও অসশস্ত্র পরিযায়ী শ্রমিকদের নিশানা করার যে ছক লক্ষ্য করা যাচ্ছে, তা রুখতে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে বলে প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্তারা আশ্বাস দিয়েছেন।

বাংলাকাল-কে ফলো করুন

Facebook Comments Box

Discover more from বাংলাকাল

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Leave a Comment

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply