শ্রীনগর, ১ আগস্ট: জম্মু ও কাশ্মীর ব্যাংকে বিপুল আর্থিক অনিয়ম ও আয়কর আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ সামনে এল। সাম্প্রতিক এক তদন্তে আয়কর বিভাগ জানতে পেরেছে, ২০২১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ব্যাংকটিতে খোলা ১.৫৪ লক্ষেরও বেশি অ্যাকাউন্টের সঙ্গে কোনো পার্মানেন্ট অ্যাকাউন্ট নম্বর বা ‘প্যান’ (PAN) যুক্ত করা হয়নি। ব্যাংকটির মোট ২ কোটির বেশি অ্যাকাউন্টের নিরিখে এই সংখ্যাটি ১ শতাংশেরও কম মনে হলেও, এর মাধ্যমে ঘটা লেনদেনের পরিমাণ শুনে চক্ষু চড়কগাছ কর্মকর্তাদের। প্যান কার্ড ছাড়াই এই অ্যাকাউন্টগুলিতে বার্ষিক ১৫ লক্ষ টাকা বা তার বেশি মূল্যের জমা পড়েছে, যার মোট আর্থিক মূল্য প্রায় ৪.৮৮ লক্ষ কোটি টাকা!
আয়কর দপ্তর সম্পূর্ণ ঘটনাটিকে ব্যাংকিং ব্যবস্থার এক “মারাত্মক পদ্ধতিগত ব্যর্থতা” (Systemic Failure) হিসেবে চিহ্নিত করেছে। তারা স্পষ্ট জানিয়েছে, এই ধরণের গাফিলতি একটি বড়সড় রেড ফ্ল্যাগ বা বিপদের সংকেত। কোনো প্যান লিংক না থাকা এবং সনাক্তকরণের সঠিক তথ্য না থাকা উচ্চমানের লেনদেনের ফলে বিপুল পরিমাণ কর ফাঁকির চরম ঝুঁকি তৈরি হয়। শুধু সাধারণ ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টই নয়, অনুসন্ধানে দেখা গেছে যে এর মধ্যে বেশ কিছু করপোরেট অ্যাকাউন্ট এবং বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত অ্যাকাউন্টও রয়েছে। ফলে কর ফাঁকি ও অনিয়মের পরিধি কোথায় গিয়ে ঠেকতে পারে, তা নিয়ে মারাত্মক উদ্বিগ্ন নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলি।
উচ্চমাত্রার লেনদেনের ক্ষেত্রে পরিচয় গোপন রেখে কোটি কোটি টাকা ব্যাংকিং চ্যানেলে ঘোরানোর সুযোগ করে দেওয়া কার্যত অপরাধমূলক উদাসীনতা বলেই মনে করছেন অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞরা। আয়কর কর্তাদের মতে, যে পরিমাণ অর্থ নির্দিষ্ট কোনো প্যান নম্বর ছাড়াই জম্মু ও কাশ্মীর ব্যাংকের এই অ্যাকাউন্টগুলিতে জমা পড়েছে, তাতে কালো টাকার কারবার এবং কর ফাঁকির সুস্পষ্ট ইঙ্গিত মিলছে। বহু ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে, বছরে ১৫ লক্ষ টাকার বেশি লেনদেন হলেও আমানতকারীর সঠিক কর সংক্রান্ত নথিপত্র ব্যাংকের সিস্টেমে নেই।
তদন্তকারী সংস্থার কঠোর অবস্থানের পর অবশ্য নড়েচড়ে বসেছে জম্মু ও কাশ্মীর ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। নিজেদের ভুল স্বীকার করে তারা জানিয়েছে, গ্রাহক সুরক্ষা এবং ব্যাংকিং নিয়ন্ত্রক নীতি মেনে চলার জন্য একাধিক জরুরি পদক্ষেপ করা শুরু হয়েছে। ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও নজরদারি ব্যবস্থা জোরদার করতে নো ইউর কাস্টমার (KYC), অ্যান্টি-মানি লন্ডারিং (AML) এবং কাউন্টারিং দ্য ফাইনান্সিং অফ টেররিজম (CFT) প্রোটোকলকে আরও কঠোর করা হয়েছে। নির্দিষ্ট কিছু ক্যাটাগরির অ্যাকাউন্টের ক্ষেত্রে এখন প্যান কার্ড জমা দেওয়া সম্পূর্ণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
এছাড়াও, কোনো অ্যাকাউন্টে অস্বাভাবিক বা সন্দেহজনক উচ্চমাত্রার আর্থিক লেনদেন হলে তা যেন সঙ্গে সঙ্গে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ধরা পড়ে, তার জন্য ব্যাংকে আধুনিক ‘অটোমেটেড মনিটরিং সিস্টেম’ চালু করা হয়েছে। আয়কর দপ্তরের তদন্তে গাফিলতি ধরা পড়ার পর ব্যাংকের পক্ষ থেকে কী কী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে, সে সম্পর্কিত একটি বিস্তারিত কমপ্লায়েন্স রিপোর্ট (Compliance Report) ইতিমিধ্যেই ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাংকের (RBI) কাছে জমা দেওয়া হয়েছে।
তবে ব্যাংকিং বিশেষজ্ঞদের বড় অংশের দাবি, রিজার্ভ ব্যাংক বা আয়কর বিভাগ বিষয়টি নিয়ে কতখানি কড়া হয় সেটাই এখন দেখার। কারণ প্যান কার্ড ছাড়া ১.৫৪ লক্ষ অ্যাকাউন্টে প্রায় পৌনে পাঁচ লাখ কোটি টাকার লেনদেন সাধারণ কোনো ব্যাংকিং ভুল হতে পারে না। এই ঘটনার পেছনে ব্যাংক কর্মকর্তাদের মদত বা বড় কোনো যোগসাজশ রয়েছে কিনা, তা জানতে আয়কর দপ্তর আরও গভীরে গিয়ে তদন্ত চালাতে পারে।
বাংলাকাল-কে ফলো করুন।
Discover more from বাংলাকাল
Subscribe to get the latest posts sent to your email.

