মাদ্রিদ, ১ আগস্ট:স্পেনের উত্তর আফ্রিকীয় সীমান্ত শহর সিউতায় গত দুই দিনে মরক্কো থেকে নজিরবিহীনভাবে প্রায় ৬০ হাজার শরণার্থী ও অভিবাসনপ্রার্থী প্রবেশ করেছেন। মাত্র ৮৫ হাজার জনসংখ্যার এই ছোট শহরটিতে ৪৮ ঘণ্টার কম সময়ে এত বিপুল সংখ্যক মানুষের হঠাৎ আগমন চরম অরাজকতা ও মানবিক সংকটের সৃষ্টি করে। স্পেনের সাম্প্রতিক ইতিহাসে এটি অন্যতম বৃহত্তম সীমান্ত অনুপ্রবেশের ঘটনা। তবে সীমান্ত অতিক্রমের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তাদের বিশাল অংশ খাদ্য, পানীয় ও উপযুক্ত আশ্রয়ের অভাবে পুনরায় মরক্কোতে ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছেন বলে জানিয়েছে স্প্যানিশ অভ্যন্তরীণ মন্ত্রণালয়।
স্পেনের সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সীমান্ত টপকে ও সমুদ্রপথে সাঁতরে সিউতায় প্রবেশ করা প্রায় ৪৮ হাজার ৩০০ জন অভিবাসনপ্রার্থী ইতিমধ্যেই মরক্কোতে ফিরে গেছেন। স্প্যানিশ সেনাবাহিনী ও পুলিশের কড়া নজরদারি এবং স্থানীয় পর্যায়ে পর্যাপ্ত অবকাঠামো না থাকার কারণে হাজার হাজার মানুষের ঠাঁই হয়নি কোথাও। বহু পরিবার, তরুণ ও অভিভাবকহীন শিশুরা খোলা আকাশের নিচে, পার্ক ও ফুটপাতে রাত কাটাতে বাধ্য হয়। তীব্র খাদ্য ও পানির সংকটের মুখোমুখি হয়ে অবশেষে বিশাল এক অংশ স্বেচ্ছায় সীমান্তে গিয়ে মরক্কোর ভূখণ্ডে ফিরে যায়। সিউতা আঞ্চলিক সরকারের প্রধান এই পরিস্থিতিকে সম্পূর্ণ অসহনীয় বলে বর্ণনা করেছেন।
এই ভয়াবহ সীমান্ত প্রবেশের চেষ্টায় অন্তত ৫৭ জন অভিবাসনপ্রার্থীর মৃত্যু হয়েছে বলে স্থানীয় উদ্ধারকারী দল ও পুলিশ নিশ্চিত করেছে। মরক্কোর ফেনিদিক ও বেলিউনেচ শহর থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার পথ সমুদ্রের উত্তাল ঢেউয়ের মধ্য দিয়ে সাঁতরে স্পেনে পৌঁছানোর সময় বহু মানুষ পানিতে ডুবে প্রাণ হারান। এ ছাড়া তারাজাল সৈকতের কাছে সীমান্তে স্থাপিত শক্ত প্রতিরক্ষা প্রাচীর টপকাতে গিয়ে তীব্র ভিড় ও হুড়োহুড়িতে পদপিষ্ট হয়ে একাধিক মানুষের করুণ মৃত্যু হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে মরক্কো ও স্পেনের নিরাপত্তা বাহিনী টিয়ার গ্যাস, জলকামান ও সতর্কতামূলক ফাঁকা গুলি ব্যবহার করে।
সংকটময় পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ স্বয়ং সিউতা সফর করেন। তিনি এই বিশাল সীমান্ত অনুপ্রবেশকে স্পেনের সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতার ওপর সরাসরি আঘাত বলে অভিহিত করেন। এই ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের জন্য মানব পাচারকারী আন্তর্জাতিক অপরাধী চক্রগুলোকে দায়ী করে তিনি জানান, সম্প্রতি স্পেনের সুপ্রিম কোর্টের দেওয়া একটি আইনি রায়কে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। পাচারকারীদের ওই ভুয়ো তথ্যের ফাঁদে পা দিয়েই হাজার হাজার তরুণ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অনিশ্চিত সমুদ্রপথে পাড়ি জমিয়েছিলেন।
বর্তমানে সীমান্তে স্বাভাবিক অবস্থা ফেরাতে স্প্যানিশ সেনাবাহিনী ও অতিরিক্ত সীমান্ত রক্ষী বাহিনী মোতায়েন রাখা হয়েছে। অনুপ্রবেশকারীদের নথিভুক্তকরণ ও দ্রুত আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিজ দেশে ফেরত পাঠাতে একটি অস্থায়ী রেজিস্ট্রেশন কেন্দ্র চালু করেছে স্থানীয় প্রশাসন। পাশাপাশি সমুদ্রে নতুন অনুপ্রবেশ রুখতে তারাজাল সৈকতের সীমান্ত বরাবর দীর্ঘ ভাসমান বোয়া ও শক্তিশালী বাধার সারি তৈরি করা হচ্ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষ থেকে পরিস্থিতি সামাল দিতে স্পেনকে পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে এবং আয়ারল্যান্ডের সভাপতিত্বে ইইউ নেতৃবৃন্দ এই সংকট মোকাবিলায় জরুরি বৈঠক ডেকেছেন।:
বাংলাকাল-কে ফলো করুন
Discover more from বাংলাকাল
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
