উত্তর ২৪ পরগনায় আক্রান্ত প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কনভয়

উত্তর ২৪ পরগনায় আক্রান্ত প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কনভয়

উত্তর ২৪ পরগনা, ৯ অগস্ট: উত্তর ২৪ পরগনার হালিশহরে পুলিশি হেফাজতে এক ব্যক্তির রহস্যজনক মৃত্যুর অভিযোগকে কেন্দ্র করে রবিবার সারাদিন ধরে ব্যাপক উত্তেজনা এবং চাঞ্চল্য ছড়ায়। এদিন ওই নিহতের শোকস্তব্ধ পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে স্থানীয়দের প্রবল ক্ষোভ এবং ভয়াবহ বিক্ষোভের মুখে পড়েন পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তথা তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর কনভয় লক্ষ্য করে এলোপাথাড়ি পাথর, কাদা এবং জুতো ছোড়া হয় বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। উত্তেজিত বিক্ষোভকারীরা প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর গাড়ি চারদিক থেকে ঘিরে ধরে তুমুল স্লোগান দিতে থাকেন এবং গাড়ির ওপর আছড়ে পড়েন। এই অপ্রত্যাশিত এবং নজিরবিহীন ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় এলাকায় চরম বিশৃঙ্খলা এবং তীব্র রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।

ঘটনার সূত্রপাত হয় বিরজু কেওট নামের এক স্থানীয় বাসিন্দার মৃত্যুকে কেন্দ্র করে। স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, হালিশহর থানার পুলিশের হেফাজতে এক রাত কাটানোর পর ওই ব্যক্তির অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়। নিহতের আত্মীয় এবং পরিজনদের স্পষ্ট অভিযোগ, পুলিশি হেফাজতে থাকার সময় তাঁর ওপর নির্মম এবং অমানবিক শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়েছিল। পরিবারের দাবি, পুলিশের সেই ব্যাপক মারধরের জেরেই ওই ব্যক্তির মৃত্যু ঘটেছে। এই ঘটনার খবর প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই স্থানীয় এলাকার পরিবেশ থমথমে ছিল। রবিবার উত্তর ২৪ পরগনায় নিহতের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সরাসরি দেখা করতে, পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে এবং তাঁদের প্রতি সমবেদনা জানাতে গিয়েছিলেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু তাঁর গাড়ি সেখানে পৌঁছানোর পরেই পরিস্থিতি আচমকা সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং তাঁর কনভয়ের ওপর বড়সড় হামলা চালানো হয়।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ এবং স্থানীয় বিভিন্ন সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর কনভয় নির্দিষ্ট এলাকায় পৌঁছানো মাত্রই একদল ক্ষুব্ধ বিক্ষোভকারী তাঁর গাড়িটি চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে। প্রবল ভিড় গাড়ির ওপর ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি করতে থাকে এবং চারপাশ থেকে মুহুর্মুহু স্লোগান উঠতে শুরু করে। পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটে যখন বিক্ষোভকারীদের বিশাল ভিড় থেকে কনভয় লক্ষ্য করে বৃষ্টির মতো ইট, পাথর, কাদা এবং জুতো ও চটি ছুড়তে শুরু করা হয়। নিরাপত্তারক্ষীরা কোনওক্রমে পরিস্থিতি সামাল দিয়ে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীকে ওই উত্তপ্ত এলাকা থেকে দ্রুত নিরাপদে সরিয়ে নিয়ে যান। তবে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর মতো একজন হেভিওয়েট রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের কনভয়ে এই আকস্মিক হামলায় পুলিশি নিরাপত্তার চরম গাফিলতি স্পষ্টভাবে প্রকাশ্যে এসেছে বলে রাজনৈতিক মহল মনে করছে।

এই অনভিপ্রেত ঘটনার পর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই হামলার অত্যন্ত কড়া ভাষায় নিন্দা করেন। তিনি ঘটনার ভয়াবহতা বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করে সাংবাদিকদের জানান যে, হামলার মাত্রা এবং তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে, সেই সময়ে যদি তাঁর গাড়ির কাঁচ সামান্য খোলাও থাকত, তবে তা তাঁর জন্য নিশ্চিতভাবে প্রাণঘাতী হতে পারত। এই নজিরবিহীন হামলার জন্য তিনি সরাসরি বর্তমান পুলিশ প্রশাসন এবং তাদের ভূমিকার দিকে আঙুল তুলেছেন। তাঁর স্পষ্ট অভিযোগ, পুলিশের প্রত্যক্ষ ছত্রছায়ায় থাকা একদল সমাজবিরোধীই এই পরিকল্পিত হামলার নেপথ্যে রয়েছে। পাশাপাশি, এই গোটা ঘটনার ইন্ধনদাতা হিসেবে তিনি ভারতীয় জনতা পার্টির নেতা শুভেন্দু অধিকারীকেও সরাসরি দায়ী করেছেন।

প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর কনভয়ে এহেন ভয়াবহ হামলার ঘটনার পর তৃণমূল কংগ্রেসের শীর্ষ নেতারা রাজ্যের বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তৃণমূল কংগ্রেস নেতৃত্বের তরফ থেকে দাবি করা হয়েছে, একজন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তথা শীর্ষ বিরোধী নেত্রীর ওপর এদিনের প্রকাশ্য হামলা প্রমাণ করে যে রাজ্যে আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা বলে আর কিছু অবশিষ্ট নেই এবং তা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। হালিশহরের স্থানীয় স্তরে রাজনৈতিক উত্তাপ ক্রমশ বাড়ছে। একদিকে পুলিশি হেফাজতে মৃত্যুর গুরুতর অভিযোগ এবং অন্যদিকে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর ওপর হামলার ঘটনা, এই দুই ইস্যুকে কেন্দ্র করে বর্তমানে রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে প্রবল চাপানউতোর এবং শাসক-বিরোধী তরজা।

বাংলাকাল-কে ফলো করুন

Facebook Comments Box

Discover more from বাংলাকাল

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Leave a Comment

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply