রায়পুর, ৯ অগস্ট: সোশ্যাল মিডিয়ায় ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার গুরুতর অভিযোগে ছত্তিশগড় খ্রিস্টান ফোরামের সভাপতি অরুণ পান্নালালকে গ্রেপ্তার করেছে রায়পুর পুলিশ। শুক্রবার গভীর রাতে তাকে গ্রেপ্তার করার পর শনিবার বিচারবিভাগীয় হেফাজতে পাঠানো হয়েছে। রাজ্যের শাসক দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) এক পদাধিকারীর লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে ৭৫ বছর বয়সী এই প্রবীণ খ্রিস্টান নেতার বিরুদ্ধে কড়া আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে রাজ্য পুলিশ। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি পোস্টকে কেন্দ্র করে এই গোটা বিতর্কের সূত্রপাত হয়।
রায়পুর পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ফেসবুকে হংসরাজ গয়াল নামক এক ব্যক্তির করা একটি পোস্টে অরুণ পান্নালাল হিন্দু দেবতা শিবকে নিয়ে একটি অত্যন্ত আপত্তিকর মন্তব্য করেছিলেন বলে অভিযোগ ওঠে। পবিত্র শ্রাবণ মাস চলাকালীন এই ধরনের মন্তব্যের জেরে স্থানীয় স্তরে বিতর্ক তীব্র আকার ধারণ করে। এরপরই ছত্তিশগড় বিজেপির মুখপাত্র অমিত চিমনানি রায়পুরের সিভিল লাইন্স থানায় সরাসরি একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। থানায় জমা দেওয়া অভিযোগে তিনি উল্লেখ করেন, এই ধরনের বিতর্কিত মন্তব্য হিন্দু ও সনাতন ধর্মের অনুগামীদের ধর্মীয় অনুভূতিতে গভীরভাবে আঘাত করেছে। এটি শুধুমাত্র একটি অবমাননাকর মন্তব্য নয়, বরং সমাজে বসবাসকারী বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে ইচ্ছাকৃতভাবে শত্রুতা ও ঘৃণা ছড়ানোর অসৎ উদ্দেশ্যে এটি করা হয়েছে। এর ফলে রাজ্যে শান্তি ও সাধারণ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি ঘটতে পারে বলেও তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন। নিজের দাবির স্বপক্ষে প্রমাণস্বরূপ তিনি পুলিশকে সোশ্যাল মিডিয়ার ওই মূল পোস্ট ও পান্নালালের করা মন্তব্যের ইউআরএল এবং স্ক্রিনশট জমা দেন।
বিজেপি নেতার এই লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে ছত্তিশগড় পুলিশের তরফ থেকে অরুণ পান্নালাল এবং মূল পোস্টকারী হংসরাজ গয়ালের বিরুদ্ধে নতুন ফৌজদারি আইন ভারতীয় ন্যায় সংহিতার (বিএনএস) একাধিক ধারায় মামলা দায়ের করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে ১৯৬ ধারা, যা বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে শত্রুতা প্রচারের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য; ২৯৯ ধারা, যা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করার উদ্দেশ্যে ইচ্ছাকৃত ও বিদ্বেষপূর্ণ কাজের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়; এবং ৩৫২(২) ধারা, যা শান্তি ভঙ্গের উদ্দেশ্যে ইচ্ছাকৃত অপমানের অভিযোগ নির্দেশ করে। সিভিল লাইন্স থানার ইন্সপেক্টর ইন-চার্জ যমন দেবাঙ্গন সংবাদমাধ্যমের কাছে নিশ্চিত করেছেন যে, শুক্রবার রাতে পান্নালালকে তার বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর শনিবার সকালে তাকে স্থানীয় ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে পেশ করা হলে আদালত তাকে সরাসরি জেল হেফাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেয়। পুলিশ আধিকারিকরা আরও জানিয়েছেন যে, মূল পোস্টকারী হংসরাজ গয়ালকে খুঁজতেও পুলিশের একটি দল তল্লাশি অভিযান শুরু করেছে এবং পুরো ঘটনাটির একটি পূর্ণাঙ্গ তদন্ত চলছে।
অন্যদিকে, সোশ্যাল মিডিয়ায় ওই আপত্তিকর মন্তব্যের বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর এবং পুলিশের এফআইআর দায়ের হওয়ার পরপরই শুক্রবার রাতে রায়পুরে অরুণ পান্নালালের বাসভবনের বাইরে ব্যাপক বিক্ষোভ প্রদর্শন করে বজরং দল এবং অন্যান্য হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের কয়েকশো কর্মী-সমর্থক। তারা ওই খ্রিস্টান নেতার বাড়ির সামনে জড়ো হয়ে তার বিরুদ্ধে প্রবল স্লোগান দিতে থাকে এবং অবিলম্বে তার গ্রেপ্তারি ও কড়া শাস্তির দাবি জানায়। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হওয়ার আশঙ্কায় এবং যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে ওই এলাকায় দ্রুত বিশাল পুলিশ বাহিনী মোতায়েন করা হয়। পুলিশের ঊর্ধ্বতন আধিকারিকদের হস্তক্ষেপে পরে বিক্ষোভকারীদের সেখান থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় এবং বর্তমানে এলাকার পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে আশ্বস্ত করা হয়েছে।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ১৯৯৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে ছত্তিশগড় খ্রিস্টান ফোরাম রাজ্যের সংখ্যালঘু খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের ওপর হওয়া বিভিন্ন নির্যাতন এবং একাধিক সামাজিক ও রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে নিয়মিতভাবে সরব থেকেছে। ৭৫ বছর বয়সী অরুণ পান্নালাল স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলোতে খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের একজন অত্যন্ত পরিচিত ও সোচ্চার মুখ হিসেবেই পরিচিত। রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও তার সক্রিয় উপস্থিতি রয়েছে। তার প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দল সর্ব আদি দল ২০২৩ সালের ছত্তিশগড় বিধানসভা নির্বাচন এবং সাম্প্রতিক ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনেও অংশগ্রহণ করেছিল। নির্বাচন বিশ্লেষকদের মতে, বেশ কয়েকটি ছোট দলের সঙ্গে তাদের প্রাপ্ত ভোট রাজ্যের প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসের ভোটব্যাংকেও কিছুটা প্রভাব ফেলেছিল। তবে বর্তমান এই গ্রেপ্তারির ঘটনা এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় করা মন্তব্য প্রসঙ্গে ছত্তিশগড় খ্রিস্টান ফোরামের অন্য কোনো প্রতিনিধি বা তার পরিবারের সদস্যদের কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া এখনও পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।
Discover more from বাংলাকাল
Subscribe to get the latest posts sent to your email.

