ইউপিআই ও রূপেই লেনদেনে ব্যাঙ্কের মাশুল চালুর প্রস্তাবিত বিল, মার্কিন বাণিজ্যের চাপ ঘিরে তৈরি রাজনৈতিক জল্পনা

ইউপিআই ও রূপেই লেনদেনে ব্যাঙ্কের মাশুল চালুর প্রস্তাবিত বিল, মার্কিন বাণিজ্যের চাপ ঘিরে তৈরি রাজনৈতিক জল্পনা

কলকাতা, ৭ আগস্ট:

ইউপিআই এবং রূপেই ডেবিট কার্ডের মাধ্যমে সম্পন্ন হওয়া আর্থিক লেনদেনে ব্যাঙ্ক ও সংশ্লিষ্ট পেমেন্ট প্রদানকারী সংস্থাসমূহকে নির্দিষ্ট হারে ফি বা মাশুল আরোপ করার সুযোগ দিতে সংসদে একটি নতুন বিল পেশ করেছে কেন্দ্রীয় অর্থ মন্ত্রক। জাতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, এতদিন ভারতের অভ্যন্তরীণ ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থায় যে শূন্য-খরচের বা বিনামূল্যে লেনদেনের মডেল চালু ছিল, এই প্রস্তাবিত আইনি সংশোধনীর মাধ্যমে সেই ব্যবস্থার অবসান ঘটতে চলেছে। দেশের কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে মূলত ডিজিটাল লেনদেন কাঠামোর দীর্ঘমেয়াদী আর্থিক স্থায়িত্ব ও অবকাঠামোগত নিরাপত্তা সুসংহত রাখার উদ্দেশ্যে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

অর্থ মন্ত্রকের এই প্রস্তাবটি এমন এক সময় সামনে আনা হয়েছে যখন ভারত এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের মধ্যকার একটি গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তি চূড়ান্ত করার বিষয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধির দপ্তর বা ইউএসটিআর পূর্বে প্রকাশিত তাদের প্রতিবেদনে অভিযোগ করেছিল যে, শূন্য-মাশুল নীতির মাধ্যমে ভারতের অভ্যন্তরীণ ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থাগুলোকে বাড়তি সুবিধা দেওয়া হচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বৈষম্যমূলক। বিশেষ করে ট্রাম্প প্রশাসন দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন পেমেন্ট সংস্থাসমূহ যেমন ভিসা এবং মাস্টারকার্ডের ব্যবসায়িক স্বার্থ রক্ষার্থে স্থানীয় পেমেন্ট ব্যবস্থার পাশাপাশি সমপরিমাণ বাণিজ্যিক সুযোগ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়ে আসছিল।

ভারতের পেমেন্ট অ্যান্ড সেটেলমেন্ট সিস্টেমস অ্যাক্ট, ২০০৭-এর সংশ্লিষ্ট ধারায় পরিবর্তনের মাধ্যমে নতুন এই বিলটি তৈরি করা হয়েছে। প্রস্তাবিত আইনে ব্যাঙ্ক এবং ডিজিটাল সার্ভিস প্রোভাইডারদের ব্যবসায়িক লেনদেনের ওপর মার্চেন্ট ডিসকাউন্ট রেট বা এমডিআর ধার্য করার আইনি কর্তৃত্ব দেওয়া হচ্ছে। জাতীয় পেমেন্ট কর্পোরেশন অফ ইন্ডিয়ার চালিত ইউপিআই দ্রুত বৃদ্ধির ফলে সাধারণ গ্রাহক থেকে শুরু করে ছোট-বড় ব্যবসায়ীরা লেনদেনে দারুণ স্বাচ্ছন্দ্য পাচ্ছিলেন। তবে ব্যাঙ্ক ও ডিজিটাল গেটওয়েগুলোর নিরাপত্তা, সাইবার অবকাঠামো এবং সার্ভার রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয় মেটাতে এই মাশুল কাঠামো পুনর্বিন্যাস প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল।

রাজনৈতিক এবং আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, যদিও কেন্দ্রীয় সরকার এবং অর্থ মন্ত্রক এই আইন সংশোধনীকে ভারতের পেমেন্ট ব্যবস্থার একটি স্বাধীন সংস্কার হিসেবে তুলে ধরছে, তবুও মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে চুক্তি আলোচনার সময়সীমা বিবেচনা করলে বোঝা যায় যে এই পরিবর্তন আমেরিকা সরকারের দীর্ঘদিনের আপত্তি নিরসনে বড় ভূমিকা পালন করবে। মার্কিন আর্থিক কাঠামোর পক্ষ থেকে বহু দিন ধরেই অভিযোগ তোলা হচ্ছিল যে বিনা খরচের পেমেন্ট মডেল থাকার ফলে আমেরিকান কোম্পানিগুলো ভারতে নতুন গ্রাহক সৃষ্টি ও বাণিজ্যিক রাজস্ব অর্জনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছিল।

সরকারের পক্ষ থেকে অবশ্য পরিষ্কার করে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে এই প্রস্তাবিত মাশুল মূলত বাণিজ্যিক বা ব্যবসায়িক লেনদেনের ওপর প্রযোজ্য হবে এবং কোনো সাধারণ ব্যক্তি থেকে ব্যক্তি লেনদেনের ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলবে না। সরকারের উদ্দেশ্য সাধারণ নাগরিকের ওপর বাড়তি অর্থনৈতিক চাপ না তৈরি করে দেশের ডিজিটাল অবকাঠামো বজায় রাখা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে ভারতের বাণিজ্যিক সম্পর্ককে সুদৃঢ় করা। আইনটি সংসদে অনুমোদিত হওয়ার পর দেশটির ডিজিটাল পেমেন্ট খাতের গতিপ্রকৃতিতে নতুন একটি বাণিজ্যিক অধ্যায়ের সূচনা হতে চলেছে।

বাংলাকাল-কে ফলো করুন

Facebook Comments Box

Discover more from বাংলাকাল

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Leave a Comment

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply