কলকাতা, ৩১ জুলাই: তীব্র রাজনৈতিক ও সামাজিক টানাপোড়েনের ইতি টেনে দীর্ঘ প্রায় ১৯ বছর পর আবার তিলোত্তমায় পা রাখলেন নির্বাসিত প্রখ্যাত বাংলাদেশি লেখিকা তসলিমা নাসরিন। শুক্রবার (৩১ জুলাই, ২০২৬) নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করার পর এই প্রত্যাবর্তনকে এক আবেগঘন ‘ঘরে ফেরা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন তিনি। ২০০৭ সালের নভেম্বর মাসে তাঁর লেখা বইকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া বিতর্ক ও হিংসাত্মক প্রতিবাদের জেরে বাধ্য হয়ে কলকাতা ছাড়তে হয়েছিল লেখিকাকে। এত বছর পর তাঁর এই প্রত্যাবর্তনকে কেন্দ্র করে পশ্চিমবঙ্গের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
আগামী শনিবার (১ আগস্ট, ২০২৬) কলকাতার রবীন্দ্র সদনে আয়োজিত একটি মৌলবাদবিরোধী সাহিত্য সভায় প্রকাশ্যে দেখা যাবে তসলিমা নাসরিনকে। সেখানে তাঁর কাব্যপাঠ করার কথা রয়েছে। সাহিত্যিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হিসেবে এটি আয়োজিত হলেও, সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গে নতুন বিজেপি সরকার গঠিত হওয়ার পর এই ইভেন্টটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ রাজনৈতিক মাত্রা পরিগ্রহ করেছে। এই অনুষ্ঠানে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এবং বিশিষ্ট সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়সহ একাধিক গুণীজন উপস্থিত থাকবেন বলে আয়োজকদের সূত্রে জানা গিয়েছে।
বিমানবন্দরে উপস্থিত সমর্থকদের উদ্দেশে জোড়হাতে নমস্কার জানিয়ে তসলিমা নাসরিন বলেন, “আবার কলকাতায় ফিরে আসতে পেরে আমার ভীষণ ভালো লাগছে।” এর আগে ২০০৪ সাল থেকে তিনি কলকাতাকেই তাঁর সাহিত্য ও সংস্কৃতির আশ্রয়স্থল হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। কিন্তু ২০০৩ সালে তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকার তাঁর আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘দ্বিখণ্ডিত’-এর কিছু অংশকে কেন্দ্র করে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার অভিযোগে বিতর্ক তৈরি হলে বইটি নিষিদ্ধ করে। পরবর্তীতে ২০০৭ সালের নভেম্বরে পরিস্থিতি চরম রূপ নেয়। তসলিমার বহিষ্কারের দাবিতে কলকাতার রাজপথে হিংসাত্মক আন্দোলন শুরু হলে সেনাবাহিনী নামাতে বাধ্য হয়েছিল তৎকালীন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য প্রশাসন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থে তাঁকে রাতারাতি কলকাতা ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। তারপর জয়পুর ও দিল্লি হয়ে বিদেশে কাটানোর পর অবশেষে ফের কলকাতায় ফিরলেন তিনি।
নিজের প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে আবেগপ্লুত তসলিমা জানান, “আমার মনে হচ্ছে আমি নিজের দেশেই ফিরে এসেছি। ভৌগোলিক কাঁটাতার আমার হৃদয়ে কোনোদিন বাংলাকে আলাদা করতে পারেনি। পূর্ব বাংলার দরজা হয়তো আমার জন্য বন্ধ হয়ে গেছে, কিন্তু আপাতত বাংলার এই অংশই আমার একমাত্র ঠিকানা।” একই সঙ্গে তিনি যোগ করেন, এই প্রত্যাবর্তন যেমন আনন্দের, তেমনই অতীতের কিছু বেদনার স্মৃতিকেও উসকে দেয়। কারণ এই শহর তাঁকে যেমন আশ্রয়, পাঠক ও বন্ধু দিয়েছিল, তেমনই একদিন তাঁকে বাধ্য হয়ে এখান থেকে চলেও যেতে হয়েছিল। তবে তিনি মনে করেন, তাঁর এই ফিরে আসা কেবল কোনো ব্যক্তিগত বিষয় নয়, বরং উগ্র ধর্মীয় মৌলবাদ যে কণ্ঠকে একসময় স্তব্ধ করতে চেয়েছিল, সেই সত্যের পুনরায় গর্জে ওঠার এক প্রতীকী রূপ।
রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘটনাটি পশ্চিমবঙ্গের বাকস্বাধীনতা এবং ধর্মীয় মৌলবাদ বিরোধী রাজনীতির এক নতুন মোড়। বিজেপি নেতৃত্বের তরফে দাবি করা হয়েছে যে, অতীতে বামফ্রন্ট ও তৃণমূল কংগ্রেস সরকার ধর্মীয় তোষণ ও মৌলবাদী চাপের কাছে নতি স্বীকার করে তসলিমা নাসরিনকে কলকাতা ছাড়া করেছিল। বর্তমান রাজ্য সরকার ও কেন্দ্র সরকারের যৌথ সহায়তায় তাঁর এই প্রত্যাবর্তনকে মুক্তচিন্তা ও বাকস্বাধীনতার জয় হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে শাসকদল। অন্যদিকে, আয়োজকদের দাবি, রবীন্দ্র সদনের এই অনুষ্ঠানটি কোনো রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম নয়, বরং ধর্মীয় মৌলবাদের বিরুদ্ধে তসলিমা নাসরিনের সারাজীবনের আপসহীন লড়াইকে সম্মান জানানোর এক মাধ্যম।
বাংলাকাল-কে ফলো করুন
Discover more from বাংলাকাল
Subscribe to get the latest posts sent to your email.

