পিএম কেয়ার্স ফান্ডে তিন বছর নেই কোনো অডিট রিপোর্ট! হাজার কোটি টাকার স্বচ্ছতা নিয়ে ক্ষুব্ধ আরটিআই কর্মীরা

পিএম কেয়ার্স ফান্ডে তিন বছর নেই কোনো অডিট রিপোর্ট! হাজার কোটি টাকার স্বচ্ছতা নিয়ে ক্ষুব্ধ আরটিআই কর্মীরা

নয়াদিল্লি, ৩১ জুলাই: মহামারী করোনার ভয়াবহ সময়ে দেশের জরুরি আপৎকালীন পরিস্থিতি মোকাবিলার উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছিল ‘পিএম কেয়ার্স ফান্ড’ (PM CARES Fund)। প্রাথমিক বছরগুলিতে হাজার হাজার কোটি টাকা কোভিড ত্রাণ ও স্বাস্থ্য পরিকাঠামো উন্নয়নে খরচের হিসাব দেখানো হলেও, গত ২০২১-২২ বা ২০২২-২৩ অর্থবর্ষের পর থেকে এই বিশালাকার তহবিলের আর কোনো নিরীক্ষিত আর্থিক বিবৃতি বা অডিট রিপোর্ট প্রকাশ্যে আনা হয়নি। প্রখ্যাত ইংরেজি দৈনিক ‘দ্য হিন্দু’ (The Hindu)-র এক প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে আসার পর থেকেই ফান্ডের স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিয়ে নতুন করে তীব্র জল্পনা ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে সাধারণ মানুষ ও রাজনৈতিক মহলে।

‘দ্য হিন্দু’-র প্রতিবেদনে বেশ কয়েকজন প্রখ্যাত তথ্য জানার অধিকার (RTI) কর্মী ও বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য উদ্ধৃত করা হয়েছে। তাঁদের দাবি, একটি সরকারি উদ্যোগে তৈরি হওয়া এবং জনগণের বিপুল আর্থিক অনুদানে গড়ে ওঠা জরুরি তহবিল থেকে এই ধরনের দীর্ঘমেয়াদী আর্থিক গোপনীয়তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

আগের হিসাব অনুযায়ী, করোনা মহামারীর চরম সংকটময় মুহূর্তে ভেন্টিলেটর ক্রয়, পরিযায়ী শ্রমিকদের সহায়তা প্রদান এবং ভ্যাকসিনের ট্রায়াল ও বিতরণে পিএম কেয়ার্স ফান্ড থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছিল। কিন্তু ২০২২-২৩ অর্থবর্ষের পরবর্তী সময় থেকে এই তহবিলে কত টাকা জমা পড়েছে কিংবা কোন খাতে কীভাবে সেই বিপুল অর্থ ব্যয় করা হয়েছে, তার কোনো হালনাগাদ নিরীক্ষিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। অডিট না হওয়া এবং সরকারি স্তরে তথ্যের এই অনুপস্থিতি ফান্ডের স্থায়িত্ব ও স্বচ্ছ প্রশাসনিক পরিচালনা নিয়েই বড়সড় প্রশ্নচিহ্ন খাড়া করে দিয়েছে।

প্রতিবেদনটি সামাজিক মাধ্যমে ও জনপরিসরে প্রকাশিত হওয়ার পরেই তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। সমাজমাধ্যমে নাগরিকরা তাঁদের ক্ষোভ উগড়ে দিয়ে জানিয়েছেন যে, সাধারণ মানুষের কষ্টের উপার্জিত অর্থ এবং কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপন্সিবিলিটি (CSR)-র আওতায় নেওয়া বিশাল অংকের টাকা যদি এভাবে অলক্ষিত থেকে যায়, তবে এই ধরনের তহবিলের মূল উদ্দেশ্যে আঘাত লাগে।

প্রশাসনিক স্বচ্ছতা সুনিশ্চিত করতে এবং পাবলিক ট্রাস্ট বা জনগণের আস্থা বজায় রাখতে অবিলম্বে সময়োচিত অডিট রিপোর্ট প্রকাশ্যে আনা অত্যন্ত প্রয়োজন। অনেক নাগরিকই মনে করছেন, যেখানে সরকারি প্রতিটি ছোটবড় খরচের হিসাব কড়ায়-গণ্ডায় রাখা হয়, সেখানে প্রধানমন্ত্রীর নামাঙ্কিত একটি আন্তর্জাতিক স্তরের ফান্ডে কেন দীর্ঘ তিন বছর ধরে নিরীক্ষা তথ্য অধরা থাকবে?

উল্লেখ্য, পিএম কেয়ার্স ফান্ড শুরু থেকেই বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে। এটি ‘সরকারি ফান্ড’ নাকি ‘বেসরকারি ফান্ড’— সেই আইনি সংজ্ঞা নিয়েও অতীতে একাধিকবার প্রশ্ন উঠেছে। সরকারি নিয়ন্ত্রণ থাকা সত্ত্বেও এটি কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল (CAG)-এর সরাসরি নিরীক্ষার আওতায় আসে না, যা শুরু থেকেই বিরোধী দল ও আইনজীবী মহলের সমালোচনার বিষয় ছিল। তা সত্ত্বেও শুরুতে একটি বেসরকারি চার্টার্ড অ্যাকাউনট্যান্ট ফার্ম দিয়ে প্রতি বছর অডিট করিয়ে তা ওয়েবসাইট ও পাবলিক ডোমেইনে আপলোড করা হতো। কিন্তু সম্প্রতি দীর্ঘ সময় ধরে সেই বার্ষিক অডিট রিপোর্ট প্রকাশিত না হওয়ায় ফান্ডের প্রশাসনিক কার্যকারিতা ও নজরদারি ব্যবস্থার বড় গলদ সামনে আসছে।

সব মিলিয়ে, পিএম কেয়ার্স ফান্ডের এই অর্থ সংক্রান্ত অস্পষ্টতা ভারতের জনস্বার্থ সংক্রান্ত আলোচনায় এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে দ্রুত অডিট রিপোর্ট পেশ করে এই জনক্ষোভ নিরসন করা হয় নাকি এই গোপনীয়তা বজায় রাখা হয়, সেদিকেই এখন নজর রাখছে সচেতন নাগরিক সমাজ।

বাংলাকাল-কে ফলো করুন

Facebook Comments Box

Discover more from বাংলাকাল

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Leave a Comment

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply