কলকাতা, ৮ আগস্ট:
আসামের বন্যাকবলিত এবং বিপন্ন মানুষের সহায়তায় এক অভূতপূর্ব মানবিক উদ্যোগের সাক্ষী থাকছে পশ্চিমবঙ্গ। রাজ্যের ২৭টি সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন একত্রিত হয়ে ‘মানবতার টানে, বন্যাদুর্গত মানুষের পাশে’ এই বার্তাকে সামনে রেখে গড়ে তুলেছে একটি যৌথ প্ল্যাটফর্ম—‘চলো আসাম’। উদ্যোগটির মূল লক্ষ্য হলো বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর কাছে দ্রুত ও সরাসরি প্রয়োজনীয় ত্রাণসামগ্রী পৌঁছে দেওয়া।
উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত প্রতিনিধিদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, যৌথ প্ল্যাটফর্মের স্বেচ্ছাসেবক দল ৯ আগস্ট হামসাফার এক্সপ্রেসে আসামের উদ্দেশে রওনা দেবে। সেখানে স্থানীয় পর্যায়ে ত্রাণ বিতরণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
এই উদ্যোগের সূচনা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ৩০ জুলাই ইমার্জেন্সি ব্লাড সার্ভিস (EBS)-এর সম্পাদক উসমান গনি খান নিজের ফেসবুক প্রোফাইলে একটি পোস্টে জানতে চান, পশ্চিমবঙ্গ থেকে আসামে ত্রাণ নিয়ে কোনো দল যাচ্ছে কি না। তবে ওই পোস্টে এমন কোনো ইতিবাচক উত্তর না পাওয়ায়, প্রায় আধ ঘণ্টা পর তিনি নিজেই মন্তব্য করেন, “আমরা প্রস্তুতি নিচ্ছি, সামনে সপ্তাহে আসছি।”
এরপর থেকেই আসামে ত্রাণ পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে প্রস্তুতি শুরু হয়। ধীরে ধীরে বিভিন্ন সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এই উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হতে থাকে। শেষ পর্যন্ত ‘চলো আসাম’ নামে একটি সমন্বিত প্ল্যাটফর্ম গড়ে ওঠে, যার মাধ্যমে সম্মিলিতভাবে ত্রাণ সংগ্রহ, সমন্বয় এবং পরিবহনের কাজ পরিচালিত হচ্ছে।
৮ আগস্ট উসমান গনি খান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানান, পশ্চিমবঙ্গের ২৭টি সংগঠন এই মানবিক উদ্যোগে একসঙ্গে যুক্ত হয়েছে। বিভিন্ন আদর্শ, কাঠামো ও কার্যপরিধির এতগুলো সংগঠনকে একই লক্ষ্য নিয়ে একত্রিত করা সহজ কাজ নয়। তবুও বন্যাদুর্গত মানুষের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তারা ঐক্যবদ্ধভাবে এই উদ্যোগকে বাস্তবায়িত করেছে, যা মানবিক সহযোগিতা ও সামাজিক সংহতির এক উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এই উদ্যোগে অংশ নেওয়া সামাজিক সংস্থাগুলোর তালিকায় রয়েছে সাহায্যের ফেরিওয়ালা, সামির ভাইয়ের সহযোগিতা, হোপ ফর সোসাইটি, সুন্দরবন ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট, শীতালিয়া মা সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার সোসাইটি, আমার ভাঙড়, বিআরপি চ্যারিটেবল ট্রাস্ট, হেল্পিং হ্যান্ড (বিসিজিএইচএইচ), অ্যাসোসিয়েশন অফ বেঙ্গলি প্রফেশনালস (এবিপি), উন্মুক্ত ফাউন্ডেশন, একতা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, জনকল্যাণ ফাউন্ডেশন এবং রক্তের বন্ধনে আমরা কৃষ্ণনগরবাসী, উম্মাহ হিউম্যানিটি, জাগরণ ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন, মিডনাইট সান, বীর নগর বীর সংগঠন, স্বপ্নপূরণ ফাউন্ডেশন গোপালনগর, হিউম্যান ওয়েলফেয়ার ব্লাড ওয়ারিয়ার, সারেঙ্গা প্রগতি সংঘ, উম্মতি মুহাম্মদ চ্যারিটেবল ট্রাস্ট, আস সফোর ফাউন্ডেশন, ইসলাম সত্য ধর্ম, নতুন আলো, আরবি ওসমান (হাত বাড়ালেই বন্ধু), জাস্টিস ফর পিপল (এনজিও) এবং কোভিড ১৯ ত্রাণ সমন্বয় মঞ্চ। প্রতিটি সংগঠন নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী খাদ্যসামগ্রী, পানীয় জল, প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র এবং অন্যান্য জরুরি সামগ্রী সংগ্রহ করে এই বিশাল ত্রাণ তহবিলে অবদান রেখেছে।
সংগঠকদের প্রতিনিধিরা সামাজিক মাধ্যমে দেশবাসী ও সাধারণ নাগরিকদের কাছে দোয়া, আশীর্বাদ ও সার্বিক সহযোগিতার আকুল আবেদন জানিয়েছেন। তাঁদের বার্তা, সম্মিলিত একতাই পারে যেকোনো কঠিনতম বিপর্যয়কে মোকাবিলা করতে এবং বিপন্ন মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে। দুর্যোগ কবলিত অঞ্চলে পৌঁছে স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তায় কীভাবে সুষ্ঠুভাবে বন্টন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা যায়, তার সুনির্দিষ্ট রূপরেখাও তৈরি করা হয়েছে। সুদূর পশ্চিমবঙ্গ থেকে গিয়ে আসামের সাধারণ মানুষের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়ার এই নজিরবিহীন মানবিক প্রচেষ্টা ইতোমধ্যেই সর্বস্তরে ব্যাপক প্রশংসা ও উৎসাহ লাভ করছে।
সাধারন মানুষের উৎসাহের নামুনা দেওয়া হল,
একজন ফেসবুক ব্যবহারকারী মল্লিকা দাস নিজের প্রোফাইলে একটি পোস্ট করে জানান, তিনি ও আরও কয়েকজনের সহযোগিতায় ৫০ প্যাকেট ওআরএস (ORS)-এর মূল্য ওসমান গনি খানের কাছে পাঠিয়েছেন। পাশাপাশি তিনি আরও মানুষকে বন্যাদুর্গতদের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়ে লিখেছেন যে, অতিরিক্ত ত্রাণসামগ্রী পাঠানোরও চেষ্টা চলছে।
মুর্শিদাবাদের RB Usman নামের একজন কন্টেন্ট ক্রিয়েটর প্রায় ১৫০ পরিবারে জন্য জামা প্যান্ট পাঞ্জাবি দিয়ে “চলো আসাম” টিম কে সাহায্য করেছেন, একথা তিনি নিজে জানিয়ে তার নিজস্ব ফেসবুক প্রোফাইলে, সবাইকে সাহায্য করার জন্য উৎসাহিত করেছেন।
কোচবিহারের দিনহাটাতে একতা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এর উদ্যোগে রমজান হোসেনের নেতৃতে আজ জুম্মা নামাজের পরে গ্রামের সাধারন মুসল্লিরা “চলো আসাম” টিমের হাতে সাহায্য করছেন আসামের দুর্গত মানুষের জন্য।

উল্লেখ্য, এই প্রতিবেদনে উল্লিখিত ঘটনাপ্রবাহ ও সময়রেখা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে উপস্থাপিত হয়েছে।
Discover more from বাংলাকাল
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
