কলকাতা, ১ আগস্ট: ডিজিটাল ভারতের পথে ঐতিহাসিক কদম বাড়িয়ে ১ আগস্ট ২০২৬ থেকে সমগ্র পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়ে গেল বহুল প্রতীক্ষিত ‘সেনসাস ২০২৭’ (Census 2027)-এর প্রথম পর্বের কাজ। দীর্ঘ ১৫ বছর পর দেশে তথা রাজ্যে আবার শুরু হলো জনসংখ্যা গণনার এই বিশাল মহাযজ্ঞ। এবারের আদমশুমারির সবচেয়ে বড় চমক ও আকর্ষণ হলো ডিজিটালাইজেশন। সাধারণ মানুষকে আর শুধু এনামারেটর বা গণনাকারীদের দরজায় আসার অপেক্ষায় দিন গুনতে হবে না; নাগরিকেরা চাইলে নিজেদের স্মার্টফোন বা কম্পিউটারের সাহায্যে ঘরে বসেই নিজেদের পরিবারের যাবতীয় তথ্য অনলাইনে নথিভুক্ত করতে পারবেন। এই আত্ম-গণনা বা ‘সেলফ-এনিউমারেশন’ (Self-Enumeration) পর্বটি ১ আগস্ট থেকে শুরু হয়ে আগামী ১৫ আগস্ট পর্যন্ত খোলা থাকবে।
রাজ্যের প্রশাসনিক সদর দফতর নবান্ন ও সেনসাস ডিরেক্টরেট সূত্রে খবর, সাধারণ মানুষের মনে সচেতনতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি করতে ১ আগস্ট সকালে রাজ্যের রাজ্যপাল এবং মুখ্যমন্ত্রী নিজেই প্রথমে এই পোর্টালের মাধ্যমে নিজেদের পরিবারের তথ্য আপলোড করে রাজ্যব্যাপী এই ডিজিটাল কার্যক্রমের শুভসূচনা করেছেন।
যাঁরা ঘরে বসেই অনলাইনের মাধ্যমে নিজেদের তথ্য জমা দিতে চান, তাঁদের জন্য কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের অধীনে একটি নির্দিষ্ট ডিজিটাল পোর্টাল (https://se.census.gov.in/) চালু করা হয়েছে। ১ আগস্ট থেকে ১৫ আগস্ট পর্যন্ত এই পোর্টালে ঢুকে নাগরিকরা তাঁদের পরিবারের যাবতীয় তথ্য নথিভুক্ত করতে পারবেন।
পদ্ধতি ও ধাপসমূহ:
- প্রথমে সেলফ-এনিউমারেশন পোর্টালে গিয়ে রাজ্য হিসেবে ‘পশ্চিমবঙ্গ’ বেছে নিতে হবে।
- পরিবারের প্রধানের নাম ও মোবাইল নম্বর নথিভুক্ত করে ক্যাপচা ভেরিফিকেশনের পর ওটিপি (OTP)-র মাধ্যমে লগ-ইন করতে হবে।
- এরপর নিজের সুবিধাজনক ভাষা নির্বাচন করে জেলার নাম, পিন কোড, ব্লক বা ওয়ার্ড তথ্য দেওয়ার পাশাপাশি একটি ডিজিটাল ম্যাপে বাড়ির অবস্থান চিহ্নিত করতে হবে।
- মূলত ‘হাউস লিস্টিং অ্যান্ড হাউজিং সেনসাস’ (House Listing and Housing Census)-এর অধীনে মোট ৩৪টি সহজ প্রশ্ন থাকবে। এর মধ্যে ঘরের দেওয়াল ও ছাদের তৈরির উপাদান, পানীয় জলের উৎস, রান্নার জ্বালানি, শৌচাগার, ড্রেনেজ ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ সংযোগ, ইন্টারনেটের ব্যবহার, বাড়িতে থাকা গাড়ি বা যোগাযোগের মাধ্যম এবং প্রধান খাদ্যশস্যের বিবরণ সংক্রান্ত তথ্য দিতে হবে।
ফর্ম সম্পূর্ণ সাবমিট হওয়ার পর সিস্টেম থেকে একটি বিশেষ ১১ ডিজিটের ‘সেলফ-এনিউমারেশন আইডি’ (SE ID) বা ইউনিক কোড তৈরি হবে। এই আইডিটি নাগরিকদের যত্ন সহকারে কাছে রেখে দিতে হবে।
অনলাইন পর্ব শেষ হওয়ার ঠিক পরদিন, অর্থাৎ ১৬ আগস্ট থেকে শুরু হবে দ্বিতীয় পর্ব বা ‘ফিল্ড এনিউমারেশন’ (Field Enumeration)। এই পর্ব চলবে ১৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। রাজ্যে প্রায় ১.৮ লাখ ফিল্ড এনিউমারটর বা তথ্যসংগ্রহকারী এবং প্রায় ৩০,০০০ সুপারভাইজার বাড়ি বাড়ি ঘুরে তথ্য যাচাই করবেন।
যাঁরা ইতিমধ্যেই ১ থেকে ১৫ আগস্টের মধ্যে অনলাইনে সেলফ-এনিউমারেশন করে ফেলেছেন, তাঁদের কেবল দরজায় আসা সরকারি গণনাকারীকে ওই ১১ ডিজিটের ‘SE ID’টি দেখাতে হবে। তথ্যসংগ্রহকারী তাঁর নির্দিষ্ট সেনসাস মোবাইল অ্যাপে ওই নম্বরটি বসিয়ে দিলেই আগে থেকে আপলোড করা সমস্ত ডাটা ভেসে উঠবে এবং তিনি কেবল বাড়ির নম্বর বা বিল্ডিংয়ের ধরণ যাচাই করে ডাটা ফাইনাল সাবমিট করে দেবেন। আর যাঁরা কোনো কারণে অনলাইনে সেলফ-এনিউমারেশন করতে পারবেন না, তাঁদের চিন্তার কোনো কারণ নেই; গণনাকারীরা নিজেরাই সরাসরি ট্যাবে বা অ্যাপে তাঁদের যাবতীয় প্রশ্নের উত্তর নথিভুক্ত করে নেবেন।
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, সেনসাস ডিরেক্টরেটের তরফে স্পষ্ট জানানো হয়েছে যে, এই আদমশুমারির জন্য নাগরিকদের কোনো ধরণের নথি (যেমন আধার, ভোটার কার্ড, রেশন কার্ড ইত্যাদি) দেখাতে হবে না। এটি সম্পূর্ণ একটি স্ব-ঘোষণা বা ‘সেলফ-ডিক্লেয়ারেশন’ ভিত্তিক প্রক্রিয়া। নাগরিকরা যা উত্তর দেবেন, গণনাকারীরা তা-ই নথিবদ্ধ করবেন।
রাজধানী কলকাতায় এই বিশালাকার অভিযান মসৃণভাবে পরিচালনা করার জন্য কলকাতা পুরসভা (KMC) ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে। শহরকে ১৪৪টি ওয়ার্ডে মোট ৮,১০৫টি এনিউমারেশন ব্লকে ভাগ করা হয়েছে, যেখানে প্রতি ব্লকে গড়ে ৭০০ থেকে ৮০০ জন নাগরিক রয়েছেন।
ডিজিটাল সেলফ-এনিউমারেশনে সাধারণ মানুষকে উৎসাহিত করতে কলকাতা পুরসভা এক অভিনব পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। শহরের প্রায় ১,০০০ সরকারি, সাহায্যপ্রাপ্ত ও বেসরকারি স্কুলের অষ্টম থেকে দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্রছাত্রীদের ‘সেনসাস প্রিফেক্ট’ (Census Prefect) হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে। নতুন প্রজন্মের প্রযুক্তি সচেতন শিক্ষার্থীরা কেবল নিজেদের পরিবারই নয়, বরং আত্মীয় ও প্রতিবেশীদেরও অনলাইনে ফর্ম পূরণে সাহায্য করবে। পুরসভার অনুমান, প্রতিটি শিক্ষার্থী অন্তত ১০টি করে পরিবারকে ডিজিটাল প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করতে সমর্থ হবে।
চলতি বছরের আগস্ট-সেপ্টেম্বরে বাড়ি চিহ্নিতকরণ এবং গৃহ গণনা পর্ব সফলভাবে শেষ হওয়ার পর, ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে শুরু হবে আসল জনসংখ্যা গণনা বা মূল ‘পপুলেশন এনিউমারেশন’ (Population Enumeration) পর্ব। সেই সময় প্রতিটি সদস্যের ব্যক্তিগত ডেমোগ্রাফিক তথ্য, যেমন— নাম, বয়স, বৈবাহিক অবস্থা, ধর্ম, প্রজাতি বা ভাষা সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য সংগৃহীত হবে।
পুরো প্রক্রিয়াটির চূড়ান্ত রেফারেন্স ডেট (Reference Date) রাখা হয়েছে ১ মার্চ, ২০২৭। সেদিনই পুরো দেশের সাথে পশ্চিমবঙ্গের চূড়ান্ত জনসংখ্যা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হবে। ভারত সরকারের ‘বিকাশ’ ও ‘প্রগতি’ নামক দুটি বিশেষ মাসকটকে সামনে রেখে এই সম্পূর্ণ ডিজিটাল ও আধুনিক আদমশুমারির মাধ্যমে দেশের প্রশাসনিক ও সামাজিক উন্নয়নের এক নতুন সূচনা হতে চলেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বাংলাকাল-কে ফলো করুন
Discover more from বাংলাকাল
Subscribe to get the latest posts sent to your email.

