উজানি আসামের ৪ জেলায় বিধ্বংসী বন্যার পেছনে লাগামহীন অবৈধ খননকেই দায়ী করলেন প্রাক্তন বিরোধী দলনেতা

উজানি আসামের ৪ জেলায় বিধ্বংসী বন্যার পেছনে লাগামহীন অবৈধ খননকেই দায়ী করলেন প্রাক্তন বিরোধী দলনেতা

গুয়াহাটি, ১ আগস্ট: উজানি আসামের চারটি জেলায় তৈরি হওয়া সাম্প্রতিক বিধ্বংসী বন্যা পরিস্থিতি কোনো সাধারণ প্রাকৃতিক দূর্যোগ নয়, বরং এটি সম্পূর্ণভাবে ‘মানুষের তৈরি বিপর্যয়’ (Man-made disaster)। ডিব্রুগড়, তিনসুকিয়া, শিবসাগর এবং চরাইদেও জেলায় দেখা দেওয়া অভূতপূর্ব বন্যা ও জলযন্ত্রণার পেছনে এলাকার অনিয়ন্ত্রিত ও অবৈধ কয়লা এবং বালি খননকেই সরাসরি দায়ী করলেন আসাম বিধানসভার প্রাক্তন বিরোধী দলনেতা তথা প্রবীণ কংগ্রেস নেতা দেবব্রত সাইকিয়া। তিনি স্পষ্ট অভিযোগ তুলেছেন যে, নদীর স্বাভাবিক গতিপথ রুদ্ধ করে এবং পরিবেশের তোয়াক্কা না করে চলা এই বেআইনি কারবারের ফলেই আজ হাজার হাজার মানুষ গৃহহীন ও বিপর্যস্ত।

কংগ্রেস নেতা দেবব্রত সাইকিয়া আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা এবং রাজ্য সরকারের উদ্দেশ্যে একটি বিস্তারিত চিঠি পাঠিয়ে এই বিষয়ে আশু পদক্ষেপ গ্রহণের কড়া দাবি জানিয়েছেন। তাঁর মতে, উজানি আসামের পাহাড়ি ও সমতল অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে চলা অবৈধ খনন কার্যপ্রক্রিয়া পরিবেশগত ভারসাম্যকে সম্পূর্ণ নষ্ট করে দিয়েছে, যার মাশুল এখন গুণতে হচ্ছে সাধারণ নদীপাড়ের বাসিন্দাদের।

চিঠিতে প্রাক্তন বিরোধী দলনেতা উল্লেখ করেছেন যে, বুড়িডিহিং, ডিসাং এবং অন্যান্য উপনদীগুলির উচ্চ অববাহিকা এলাকায় ক্রমাগত বেআইনিভাবে পাথর, বালি এবং কয়লা উত্তোলনের কাজ চলছে। পাহাড় কেটে মাটি ও পাথর নদীগর্ভে ফেলার ফলে নদীর স্বাভাবিক নাব্য হ্রাস পেয়েছে। স্বাভাবিকের চেয়ে সামান্য বেশি বৃষ্টিপাত হলেই নদীগুলি সেই অতিরিক্ত জল ধরে রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে, যার ফলে মুহূর্তের মধ্যে তীরবর্তী গ্রাম ও বিস্তীর্ণ কৃষিজমি প্লাবিত হয়ে পড়ছে।

তিনি অভিযোগ করেন যে, প্রশাসন ও বন দপ্তরের নজরদারির অভাবেই এই অবৈধ খনন সিন্ডিকেট ব্যাপকভাবে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে সংরক্ষিত বনাঞ্চল ও সংবেদনশীল পাহাড়ি ঢালে যেভাবে ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে খননকার্য চালানো হচ্ছে, তা ওই অঞ্চলের প্রাকৃতিক জলনিকাশি ব্যবস্থাকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দিয়েছে। এর ফলেই প্রতি বর্ষায় প্লাবনের রূপ ক্রমেই মারমুখী হয়ে উঠছে।

উজানি আসামের চার জেলা— ডিব্রুগড়, তিনসুকিয়া, শিবসাগর এবং চরাইদেও-র বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। সরকারি হিসেব অনুযায়ী, প্লাবনের কারণে হাজার হাজার বিঘা জমির ধান ও শীতকালীন সবজি জলের তলায় তলিয়ে গেছে, যা অঞ্চলের গ্রামীণ অর্থনীতিকে এক বিরাট ধাক্কা দিয়েছে। শতাধিক গ্রাম পুরোপুরি জলবন্দি হয়ে পড়ায় সাধারণ মানুষ বাধ্য হয়ে বাঁধ, জাতীয় সড়ক ও উঁচু সরকারি আশ্রয় শিবিরে ঠাঁই নিয়েছেন।

দেবব্রত সাইকিয়া জোর দিয়ে বলেন যে, কেবল সাময়িক ত্রাণ বিতরণ করে বা বাঁধের ওপর তালি মারা মেরামত দিয়ে এই সংকট থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয়। যতক্ষণ না এই অবৈধ খনন বন্ধের বিরুদ্ধে সরকার কোনো কঠোর রূপরেখা তৈরি করছে, ততক্ষণ পর্যন্ত উজানি আসামকে প্রতি বছর এই কৃত্রিম বন্যার মাশুল গুনতে হবে।

বিপর্যয় মোকাবিলায় প্রবীণ এই রাজনৈতিক নেতা রাজ্য সরকারের কাছে একাধিক সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব পেশ করেছেন। প্রথমত, উজানি আসামের চার জেলার নদী ব্যবস্থা ও পাহাড়ি অঞ্চলের পরিবেশগত পরিস্থিতি মূল্যায়নের জন্য একটি স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের দল গঠন করে অবিলম্বে ‘এনভায়রনমেন্টাল অডিট’ বা পরিবেশগত পর্যালোচনা করার দাবি জানিয়েছেন তিনি।

দ্বিতীয়ত, যে সমস্ত অবৈধ কয়লা ও বালি মাফিয়া এই বিপর্যয়ের পেছনে সক্রিয়, তাদের চিহ্নিত করতে একটি উচ্চপর্যায়ের জুডিশিয়াল বা বিচারবিভাগীয় তদন্তের আর্জি জানানো হয়েছে। এর পাশাপাশি ক্ষতিপূরণ বাবদ বন্যাদুর্গত পরিবারগুলিকে আর্থিক সহায়তা এবং কৃষকদের বিনামূল্যে বীজ ও ঋণ মকুবের জোর দাবি তুলেছেন তিনি।

রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে অবশ্য এখনও এই চিঠির বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া দেওয়া হয়নি। তবে রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলে সাইকিয়ার এই বক্তব্য আসামের বন্যায় কৃত্রিম হস্তক্ষেপের বিষয়টি নিয়ে নতুন করে জলঘোলা শুরু করেছে।

বাংলাকাল-কে ফলো করুন

Facebook Comments Box

Discover more from বাংলাকাল

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Leave a Comment

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply