টিকিট ছাড়া ট্রেনে উঠতে বাধা, প্ল্যাটফর্মে কানওয়ারিয়াদের সঙ্গে টিটিই-র বচসার ভিডিও ঘিরে বিতর্ক

টিকিট ছাড়া ট্রেনে উঠতে বাধা, প্ল্যাটফর্মে কানওয়ারিয়াদের সঙ্গে টিটিই-র বচসার ভিডিও ঘিরে বিতর্ক

সীতামঢ়ী, ৯ অগস্ট: শ্রাবণ মাস মানেই শিবভক্ত কানওয়ারিয়াদের ঢল। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পুণ্যার্থীরা বাঁক কাঁধে ছুটে যান দেওঘর-সহ বিভিন্ন তীর্থস্থানে। বিপুল সংখ্যক মানুষের যাতায়াতের সুবিধার্থে রেলওয়ের তরফ থেকে বিশেষ শ্রাবণী মেলা ট্রেনের ব্যবস্থাও করা হয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও সাধারণ যাত্রীবাহী ট্রেনগুলিতে উপচে পড়া ভিড় এবং টিকিট ছাড়া ভ্রমণের প্রবণতা অনেক সময়ই রেলকর্মীদের জন্য বড়সড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। সম্প্রতি বিহারের সীতামঢ়ী জেলার এমন একটি ঘটনাই সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। দেবী সীতার জন্মস্থান হিসেবে পরিচিত সীতামঢ়ী জেলার স্থানীয় খবর সম্প্রচারকারী একটি এক্স (সাবেক টুইটার) হ্যান্ডেল থেকে শেয়ার করা একটি ভিডিও ঘিরে নেটিজেনদের মধ্যে বিতর্কের ঝড় উঠেছে।

গত ৮ অগস্ট ‘@সীতামঢ়ীজিলা’ নামক ওই এক্স হ্যান্ডেল থেকে একটি ৩১ সেকেন্ডের ভিডিও পোস্ট করা হয়। ভিডিওটিতে দেখা যাচ্ছে, একটি রেলওয়ে স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে থাকা একটি গোলাপি ট্রেনের সামনে কর্তব্যরত এক টিকিট পরীক্ষক (টিটিই) এবং একদল কানওয়ারিয়ার মধ্যে তুমুল বচসা চলছে। পুণ্যার্থীদের পরনে ঐতিহ্যবাহী গেরুয়া রঙের পোশাক এবং তাদের পায়ে কোনও জুতো নেই। খালি পায়ে থাকা এই শিবভক্তরা ট্রেনে ওঠার চেষ্টা করলে কর্তব্যরত টিটিই তাদের পথ আটকে দাঁড়ান। তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন যে, বৈধ টিকিট ছাড়া কোনওভাবেই তাদের ট্রেনের ভেতরে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না। ভিডিওতে টিটিই-কে বেশ কড়া সুরেই নিয়ম মনে করিয়ে দিতে শোনা যায়। তিনি সতর্ক করে বলেন যে, টিকিট ছাড়া ট্রেনে উঠলে ৫০০ টাকা ভাড়ার পাশাপাশি জরিমানাও গুনতে হবে।

এই কথা শোনার পরেই পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। টিকিট পরীক্ষকের এই কঠোর অবস্থানের প্রতিবাদে বেশ কয়েকজন পুণ্যার্থী ক্ষোভে ফেটে পড়েন। ভিডিওর একটি অংশে দেখা যায়, অত্যন্ত হতাশ এবং ক্ষুব্ধ এক কানওয়ারিয়া টিকিট পরীক্ষকের দিকে আঙুল উঁচিয়ে রাগের মাথায় কিছু বলছেন এবং অঙ্গভঙ্গি করছেন। প্ল্যাটফর্মের অন্যান্য যাত্রীরাও এই আকস্মিক উত্তেজনার দৃশ্য দাঁড়িয়ে দেখতে থাকেন। একদিকে ধর্মীয় ভাবাবেগ এবং অন্যদিকে রেলের সরকারি নিয়মকানুন, এই দুইয়ের টানাপোড়েনে স্টেশনের পরিবেশ বেশ কিছুক্ষণের জন্য থমথমে হয়ে ওঠে।

বিহারের দেওঘর এবং অন্যান্য শৈব তীর্থক্ষেত্রগুলিতে এই সময়ে লক্ষ লক্ষ মানুষের সমাগম ঘটে। পুণ্যার্থীরা দীর্ঘ পথ হেঁটে শিবলিঙ্গে জল ঢালার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। রেলওয়ে বোর্ড প্রতি বছরই এই যাত্রীদের সুবিধার্থে একাধিক স্পেশাল ট্রেন চালায়। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি হল, স্পেশাল ট্রেনের সংখ্যা বাড়ানো হলেও তা এই বিপুল সংখ্যক মানুষের যাতায়াতের জন্য অনেক সময়ই যথেষ্ট হয় না। ফলে বাধ্য হয়েই পুণ্যার্থীদের একাংশ সাধারণ ট্রেনে ভিড় জমান। আর তখনই টিকিট কাটা নিয়ে তৈরি হয় জটিলতা। টিকিট পরীক্ষকদের উপর যেমন রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের কড়া নির্দেশ থাকে বিনা টিকিটের যাত্রীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার, ঠিক তেমনই ধর্মীয় কারণে যাত্রীদের আবেগ সামলানোও তাদের জন্য একটি সংবেদনশীল কাজ হয়ে দাঁড়ায়। সীতামঢ়ী স্টেশনের এই ঘটনাটি সেই বৃহত্তর সমস্যারই একটি স্পষ্ট নিদর্শন।

সোশ্যাল মিডিয়ায় ভিডিওটি পোস্ট হওয়ার মুহূর্তের মধ্যেই তা ভাইরাল হয়ে যায়। ইতিমধ্যেই পোস্টটিতে সাতশোরও বেশি লাইক পড়েছে এবং কমেন্ট বক্সে সাধারণ মানুষ নিজেদের মতামত ব্যক্ত করতে শুরু করেছেন। নেটিজেনদের প্রতিক্রিয়া মূলত দুটি ভাগে বিভক্ত হয়ে গিয়েছে। ব্যবহারকারীদের একাংশের মতে, এই পবিত্র শ্রাবণ মাসে খালি পায়ে হেঁটে চলা পুণ্যার্থীদের প্রতি রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের আরও কিছুটা সহানুভূতিশীল হওয়া উচিত ছিল। ধর্মীয় আবেগ ও ভক্তির কথা মাথায় রেখে তাদের কিছুটা ছাড় দেওয়া যেত বলে তারা মনে করছেন। কিন্তু অন্যদিকে, একটি বড় অংশের মানুষ টিটিই-র কাজের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। তাদের মতে, সরকারি নিয়ম সবার জন্যই সমান হওয়া উচিত এবং আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে কোনও আপস করা ঠিক নয়। কর্তব্যরত টিকিট পরীক্ষক কেবল নিজের দায়িত্ব পালন করেছেন এবং বিনা টিকিটে ভ্রমণের বেআইনি প্রবণতাকে আটকাতে তিনি যে দৃঢ়তা দেখিয়েছেন, তা প্রশংসনীয়। নিয়ম বনাম সহানুভূতির এই বিতর্ক আপাতত সোশ্যাল মিডিয়ার দেওয়ালে কানওয়ার যাত্রার অন্যতম চর্চিত বিষয় হয়ে উঠেছে।

বাংলাকাল-কে ফলো করুন

Facebook Comments Box

Discover more from বাংলাকাল

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Leave a Comment

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply