নয়াদিল্লি, ১১ অগাস্ট:
কেন্দ্রীয় মন্ত্রী এবং ভারতীয় জনতা পার্টির প্রাক্তন সর্বভারতীয় সভাপতি নিতিন গড়করির ছেলে নিখিল নিতিন গড়করি এবং তাঁর ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান সিয়ান অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যান্ড ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেডের দায়ের করা দশ কোটি টাকার মানহানির মামলায় সংবাদ সাময়িকী দ্য ক্যারাভান-এর প্রধান সম্পাদক এবং সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকদের নোটিশ জারি করল দিল্লি হাইকোর্ট। ক্যারাভান পত্রিকায় প্রকাশিত একটি বিতর্কিত প্রতিবেদনের মাধ্যমে নিখিল গড়করি এবং তাঁর কোম্পানির সুনাম উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ক্ষুণ্ণ করা হয়েছে, এই গুরুতর অভিযোগ তুলেই আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন বাদীপক্ষ। সোমবার দিল্লি হাইকোর্টের বিচারপতি সুব্রমনিয়াম প্রসাদ এই মানহানির মামলার প্রাথমিক শুনানি গ্রহণ করেন এবং বিবাদীপক্ষের কাছে থেকে এই বিষয়ে বিস্তারিত লিখিত জবাব তলব করেছেন। পাশাপাশি, বিতর্কিত প্রতিবেদনটি অবিলম্বে সমস্ত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম থেকে সরিয়ে ফেলার জন্য যে অন্তর্বর্তীকালীন স্থগিতাদেশের আবেদন করা হয়েছে, সেই বিষয়েও ক্যারাভান পত্রিকার কর্তৃপক্ষকে নোটিশ জারি করেছে উচ্চ আদালত। আগামী ৩১ অগাস্ট এই বহুল চর্চিত মামলার পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করা হয়েছে।
আদালত সূত্রে জানা গিয়েছে, এই আইনি বিবাদের মূল কেন্দ্রবিন্দু হলো গত ১ মার্চ, ২০২৬ তারিখে ক্যারাভান পত্রিকায় প্রকাশিত একটি বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন। নাগপুরস বিফ – দ্য বিফ কোম্পানি এনমেসড ইন গড়করিস বিজনেস এম্পায়ার শিরোনামের ওই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছিল যে, নিখিল গড়করির ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান সিয়ান অ্যাগ্রোর সঙ্গে গোমাংস রপ্তানিকারক সংস্থা রেমবাল অ্যাগ্রো অ্যান্ড ফুডস-এর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়িক সম্পর্ক রয়েছে। রেমবাল অ্যাগ্রো বর্তমানে ভেনাদ ফুড ইন্ডাস্ট্রিজ নামে পরিচিত। ক্যারাভান-এর ওই প্রতিবেদনে দাবি করা হয় যে, শেয়ারহোল্ডিং, বিভিন্ন আর্থিক ঋণ আদানপ্রদান এবং সাধারণ ব্যবসায়িক লেনদেনের মাধ্যমে এই দুই সংস্থার মধ্যে গভীর সংযোগ রয়েছে। তবে বাদীপক্ষ আদালতে এই সমস্ত দাবিকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, মিথ্যা এবং বিভ্রান্তিকর বলে উড়িয়ে দিয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, এই ধরনের মনগড়া প্রতিবেদন প্রকাশের মাধ্যমে সমাজে তাঁদের সম্পর্কে একটি সম্পূর্ণ ভ্রান্ত ধারণা তৈরি করা হয়েছে এবং তাঁদের বহু বছরের তৈরি করা ব্যবসায়িক ভাবমূর্তি কালিমালিপ্ত করার হীন চেষ্টা করা হয়েছে।
আদালতে জমা দেওয়া হলফনামায় সিয়ান অ্যাগ্রো এবং তার ম্যানেজিং ডিরেক্টর নিখিল গড়করি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, তাঁদের কোম্পানি সম্পূর্ণরূপে একটি নিরামিষ কৃষিজাত পণ্য উৎপাদনকারী এবং প্রক্রিয়াকরণ সংস্থা। তাঁরা মূলত হিমায়িত শাকসবজি, বিভিন্ন ধরনের মশলা, চিনি, ভোজ্যতেল এবং অন্যান্য নিরামিষ কৃষিজাত পণ্যের উৎপাদন ও ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। গোমাংস, মহিষের মাংস বা অন্য কোনো পশুর মাংস প্রক্রিয়াকরণ, ব্যবসা বা রপ্তানির সঙ্গে তাঁদের কোনো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পর্ক নেই। এমনকি এই ধরনের ব্যবসার জন্য তাঁদের কাছে কখনোই কোনো সরকারি লাইসেন্স, আইনি পারমিট বা কোনো ধরনের রেগুলেটরি অনুমোদন ছিল না বলেও তাঁরা হলফনামায় জোরালো দাবি করেছেন। রেমবাল অ্যাগ্রো সম্পূর্ণ একটি পৃথক আইনি সত্তা এবং তার কোনো ব্যবসায়িক কার্যকলাপের দায়ভার সিয়ান অ্যাগ্রোর ওপর চাপানো যায় না বলে বাদীপক্ষ যুক্তি দিয়েছে। নিখিল গড়করির আইনজীবীদের দাবি, একজন বর্ষীয়ান এবং প্রভাবশালী কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর ছেলে হওয়ার কারণেই তাঁকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এই বিতর্কে জড়িয়ে রাজনৈতিকভাবে কালিমালিপ্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
মানহানির মামলা দায়ের করার আগে গত ৪ মার্চ বাদীপক্ষের তরফ থেকে ক্যারাভান কর্তৃপক্ষকে একটি আইনি নোটিশ পাঠানো হয়েছিল। সেই নোটিশে বিতর্কিত প্রতিবেদনটি অবিলম্বে সরিয়ে ফেলা এবং নিঃশর্ত ক্ষমা চাওয়ার কড়া দাবি জানানো হয়। তবে ক্যারাভান কর্তৃপক্ষ সেই দাবি প্রত্যাখ্যান করে পালটা জবাব দেয়। তারা জানায় যে, তাদের প্রতিবেদনটি সম্পূর্ণ নথিপত্র এবং তথ্যভিত্তিক। সাংবাদিকতার সাধারণ ধর্ম মেনে এবং বৃহত্তর জনস্বার্থেই এই প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়েছে। ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ৩৫৬ নম্বর ধারায় মানহানির যে ব্যতিক্রমী নিয়ম রয়েছে, তার অধীনেই এই প্রতিবেদন আইনিভাবে সুরক্ষিত বলে তারা দাবি করে। এরপরই নিখিল গড়করি এবং তাঁর কোম্পানি দিল্লি হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়ে দশ কোটি টাকার বিপুল অঙ্কের আর্থিক ক্ষতিপূরণ এবং ওই প্রতিবেদনটি স্থায়ীভাবে মুছে ফেলার আবেদন জানিয়েছেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় এই প্রতিবেদনের ক্রমাগত প্রচার তাঁদের ব্যবসায়িক সুনাম এবং পারিবারিক মর্যাদাকে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে বলে আদালতকে জানানো হয়েছে। এখন দেখার বিষয়, আগামী শুনানিতে ক্যারাভান পত্রিকা নিজেদের দাবির সপক্ষে কী ধরনের তথ্যপ্রমাণ বা আইনি যুক্তি আদালতের সামনে উপস্থাপন করে।
Discover more from বাংলাকাল
Subscribe to get the latest posts sent to your email.

