নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ আইন ২০২৩: ‘প্রধানমন্ত্রী গণতন্ত্র বিনষ্ট করবেন ধরে নেওয়া ভুল’, সুপ্রিম কোর্টে কেন্দ্রের জোরালো সওয়াল

নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ আইন ২০২৩: ‘প্রধানমন্ত্রী গণতন্ত্র বিনষ্ট করবেন ধরে নেওয়া ভুল’, সুপ্রিম কোর্টে কেন্দ্রের জোরালো সওয়াল

নয়াদিল্লি, ৩১ জুলাই: প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগ সংক্রান্ত ২০২৩ সালের নতুন কেন্দ্রীয় আইনকে সুপ্রিম কোর্টে শক্ত হাতে সমর্থন জানাল কেন্দ্র সরকার। আইনি সংবাদভিত্তিক পোর্টাল ‘লাইভ ল’ (LiveLaw)-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, সর্বোচ্চ আদালতে শুনানি চলাকালীন কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষে সওয়াল করতে গিয়ে দেশের সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন যে, প্রধানমন্ত্রী গণতন্ত্রের বুনিয়াদকে দুর্বল করবেন বা সদিচ্ছার অভাব নিয়ে কাজ করবেন— আদালত কখনোই এমন পূর্বাভাস বা অনুমান করে সিদ্ধান্ত নিতে পারে না।

নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের ক্ষেত্রে গঠিত নতুন প্যানেলের নিরপেক্ষতা এবং এই সংক্রান্ত আইনের বৈধতাকে চ্যালেঞ্জ করে দায়ের হওয়া একাধিক আবেদনের শুনানিতে সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন সলিসিটর জেনারেল।

প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ আইন, ২০২৩-এর মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনার নির্বাচনের জন্য একটি উচ্চপর্যায়ের ‘সিলেকশন কমিটি’ বা নির্বাচন কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটিতে রয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী, একজন কেন্দ্রীয় ক্যাবিনেট মন্ত্রী এবং লোকসভার বিরোধী দলনেতা (বা একক বৃহত্তম বিরোধী দলের নেতা)।

মূলত এই কমিটির গঠনপ্রক্রিয়াকেই আদালতে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে। আবেদনকারীদের মতে, এই ধরনের প্যানেলে তিনজনের মধ্যে দুজনই সরকারপক্ষের প্রতিনিধি (প্রধানমন্ত্রী এবং তাঁর মনোনীত ক্যাবিনেট মন্ত্রী) হওয়ায় পুরো প্রক্রিয়াটির ওপর কার্যনির্বাহী শাখার একচ্ছত্র প্রভাব তৈরি হয়। এর ফলে নির্বাচন কমিশনের মতো সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে বলে মামলাকারীদের দাবি।

এর আগে ২০২৩ সালে সুপ্রিম কোর্টের একটি সংবিধান বেঞ্চ দেশের নির্বাচন প্রক্রিয়া ও নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা সুনিশ্চিত করতে একটি অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা নির্দেশ করেছিল। সেই নির্দেশ অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের প্যানেলে রাখা হয়েছিল ভারতের প্রধান বিচারপতি (CJI), প্রধানমন্ত্রী এবং লোকসভার বিরোধী দলনেতাকে।

সুপ্রিম কোর্ট তখন স্পষ্ট করে বলেছিল যে, ভারতের সংবিধানের ৩২৪ নম্বর অনুচ্ছেদের অধীনে সংসদ যতদিন না পর্যন্ত কোনো সুনির্দিষ্ট আইন প্রণয়ন করছে, ততদিন পর্যন্ত নিরপেক্ষতা বজায় রাখার লক্ষ্যে এই অন্তর্বর্তী প্যানেল কার্যকর থাকবে। কিন্তু পরবর্তীকালে কেন্দ্রীয় সরকার নতুন আইন পাসের মাধ্যমে সেই প্যানেল থেকে প্রধান বিচারপতিকে বাদ দিয়ে একজন ক্যাবিনেট মন্ত্রীকে অন্তর্ভুক্ত করে। মামলাকারীদের বক্তব্য, এটি সুপ্রিম কোর্টের অন্তর্বর্তী নির্দেশের মূল ভাবনার পরিপন্থী।

আদালতের কক্ষে শুনানি চলাকালীন কেন্দ্রের পক্ষে সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা নতুন আইনটির যৌক্তিকতা তুলে ধরেন। তিনি যুক্তি দেন যে, একটি গণতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন প্যানেলকে শুরুতেই সন্দেহের চোখে দেখা অন্যায়। প্রধানমন্ত্রী দেশ পরিচালনার দায়িত্বে থাকেন এবং দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে রক্ষা করা তাঁর অন্যতম প্রধান সাংবিধানিক দায়িত্ব। আদালত বা আবেদনকারীরা যদি এমন কোনো পূর্বধারণা তৈরি করে নেন যে প্রধানমন্ত্রী বা নির্বাহী বিভাগ ক্ষতিকর উদ্দেশ্যে কাজ করবে, তবে তা দেশের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক ব্যবস্থার প্রতি অবিচার। তিনি আরও স্মরণ করিয়ে দেন যে, সংবিধানের ৩২৪(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংসদকে নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের বিষয়ে আইন তৈরি করার স্পষ্ট একক অধিকার বা লেজিসলেটিভ অথরিটি দেওয়া হয়েছে।

মামলার শুনানিতে বিচারপতি দীপঙ্কর দত্তের নেতৃত্বাধীন সুপ্রিম কোর্টের বেঞ্চ বিষয়টিকে অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করেন। বিচারপতি বেঞ্চ উল্লেখ করেন যে, সংবিধানে নির্বাচন কমিশনকে স্বাধীনভাবে কাজ করার যে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, তার সুরক্ষায় প্রধান নির্বাচন কমিশনারের ভূমিকা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

বিচারপতিদের বেঞ্চ শুনানিকালে প্রশ্ন তোলেন, বর্তমান সিলেকশন প্যানেলের যে গঠন কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে, তা প্রধান নির্বাচন কমিশনারের মতো অতি গুরুত্বপূর্ণ পদের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের ক্ষেত্রে যথেষ্ট স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতা বজায় রাখতে সক্ষম কি না। যদিও বেঞ্চ একই সঙ্গে এই বিষয়টিও পুনর্ব্যক্ত করে যে, সংবিধানের ৩২৪ নম্বর অনুচ্ছেদের অধীনে আইন প্রণয়ন করার সার্বিক আইনি একতিয়ার ও ক্ষমতা ভারতের সংসদের রয়েছে।

শুনানিতে উঠে আসে সাংবিধানিক ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষার বিষয়টিও। একদিকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের মতো স্পর্শকাতর প্রক্রিয়ায় কোনো একমুখী রাজনৈতিক প্রভাব যাতে কার্যকর হতে না পারে, সে জন্য আদালতের হস্তক্ষেপর দাবি তুলেছেন আবেদনকারীরা। অন্যদিকে, কেন্দ্র সরকারের মূল বক্তব্য হলো, সংসদ যখন সংবিধানের গণ্ডির মধ্যে থেকেই উপযুক্ত আইন পাস করেছে, তখন আইনসভার সেই সিদ্ধান্তকে সম্মান জানানোই বাঞ্ছনীয়।

সুপ্রিম কোর্টে এই মামলার চূড়ান্ত রূপ কী দাঁড়ায় এবং নির্বাচন কমিশনের মতো সাংবিধানিক সংস্থার নিয়োগ প্রক্রিয়ায় নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ আদালত কী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, সেদিকেই এখন তীক্ষ্ণ নজর রাখছে গোটা দেশের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক মহল।

বাংলাকাল-কে ফলো করুন

Facebook Comments Box

Discover more from বাংলাকাল

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Leave a Comment

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply