নতুন দিল্লি, ০৪ আগস্ট:১৩৫ বছরের পুরনো ঔপনিবেশিক আমলের আইন সংস্কার করে দেশের ব্যাংক ব্যবস্থা এবং আদালত প্রক্রিয়াকে আধুনিক যুগের উপযোগী করতে লোকসভায় নতুন বিল পেশ করলেন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন। ১৮৯১ সালের ব্যাঙ্কার্স বুকস এভিডেন্স অ্যাক্ট বা ব্যাংকের বইপত্রের প্রমাণ সংক্রান্ত পুরনো আইনটি রদ করে ব্যাংকার্স বুকস এভিডেন্স বিল ২০২৬ পাস করানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেন্দ্র। প্রস্তাবিত এই নতুন আইনটি কার্যকর হলে ভারতের ব্যাংকিং নথি সংক্রান্ত আইনি পরিচয় এবং আদালতে ডিজিটাল প্রমাণের গ্রহণযোগ্যতায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে। বর্তমানে ব্যাংকিং ব্যবস্থার একটি বড় অংশ কোর ব্যাংকিং প্রযুক্তি, ক্লাউড ব্যাকআপ, সিস্টেম চালিত রসিদ এবং মোবাইল অ্যাপ নির্ভর হলেও পুরনো আইনের ভাষা ছিল মূলত কাগুজে নথি ও ফিজিক্যাল খাতার ওপর নির্ভরশীল। লোকসভায় বিলটি উপস্থাপন করার সময় জানানো হয় যে নতুন আইন পাসের পর ইলেকট্রনিক, ডিজিটাল এবং ক্লাউড-ভিত্তিক সব ধরনের রেকর্ডকেই আইনি প্রক্রিয়ায় বৈধ প্রমাণ হিসেবে গণ্য করা হবে।
বিদ্যমান ব্যাংকিং ব্যবস্থায় গ্রাহকদের তথ্য সংরক্ষণ ও আইনি জটিলতা নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে যে বিলম্ব হতো, নতুন বিল পাসের মাধ্যমে তা অনেকাংশেই হ্রাস পাবে বলে আশা করা হচ্ছে। আগে আইনি বিরোধ বা বিচারিক প্রক্রিয়ায় ব্যাংকের কোনো নথি প্রয়োজন হলে ফিজিক্যাল খাতা বা সিলমোহর দেওয়া কাগজের অনুলিপি পেশ করার বাধ্যবাধকতা ছিল। নতুন আইনের ফলে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে তৈরি ব্যাংকিং নথি কিংবা অনলাইন লেনদেনের ডিজিটাল প্রমাণের সার্টিফায়েড ইলেকট্রনিক কপি আদালতে সমপরিমাণ গুরুত্ব পাবে। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই পরিবর্তনের মূল উদ্দেশ্য হলো সমসাময়িক ডিজিটাল ব্যাংকিং ব্যবস্থার সঙ্গে আইনি পরিকাঠামোর সামঞ্জস্য সাধন করা এবং ব্যাংকগুলোকে অপ্রয়োজনীয় আদালতের নোটিশ ও হাজিরা দেওয়া থেকে কিছুটা স্বস্তি প্রদান করা। এর ফলে সাধারণ গ্রাহক ও ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে সাইবার জালিয়াতি, ইএমআই বিরোধ, চেক বাউন্স বা উত্তরসূরি সংক্রান্ত মামলার নিষ্পত্তি দ্রুত তরান্বিত হবে।
বিলে আদালত এবং ব্যাংক কর্মকর্তাদের সুরক্ষার বিষয়েও সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা যুক্ত করা হয়েছে। কোনো মামলায় ব্যাংক যদি সরাসরি পক্ষ বা মূল অভিযুক্ত না হয়, সে ক্ষেত্রে সাধারণ নোটিশ পাঠিয়েই ব্যাংকের কর্মকর্তা বা নথি আদালতে তলব করা যাবে না। কেবল বিশেষ কোনো আইনি কারণ দর্শাতে পারলেই আদালত ব্যাংকের কর্তাদের সাক্ষ্য প্রদান বা নথি পেশের নির্দেশ দিতে পারবে। এর মাধ্যমে রুটিন আইনি লড়াইয়ে ব্যাংক কর্মকর্তাদের বারবার আদালতে হাজির হওয়ার ঝক্কি অনেকটাই কমবে এবং ব্যাংকের দৈনন্দিন কাজকর্ম ব্যাহত হওয়া থেকে রক্ষা পাবে। পাশাপাশি কেন্দ্রীয় সরকারকে ভবিষ্যতে এই আইনের আওতা বাড়িয়ে ব্যাংকের বাইরে থাকা অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও ফিনটেক সংস্থাগুলোর ওপরেও ডিজিটাল নথির আইনি নিয়ম বলবৎ করার ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে।
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিজিটাল ইন্ডিয়া এবং ফিনটেক বিপ্লবের এই সময়ে ব্যাংকের তথ্য কেবল একটি কাগুজে স্টেটমেন্টে সীমাবদ্ধ নেই। একটি সাধারণ ব্যাংক ট্রান্সফার থেকে শুরু করে বড় আকারের ঋণ অনুমোদন পর্যন্ত সমস্ত তথ্য এখন ইলেকট্রনিক লগে সংরক্ষিত থাকে। পুরোনো ঔপনিবেশিক আইনে এই ধরনের ডিজিটাল ট্রেইল গ্রহণ করার ক্ষেত্রে আইনি অস্পষ্টতা থেকে যেত, যা আদালত প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা সৃষ্টি করত। ব্যাংকার্স বুকস এভিডেন্স বিল ২০২৬ চালু হলে আইনি ব্যবস্থার মূল নজর কাগুজে নথির সততা প্রমাণের বদলে ডিজিটাল সার্টিফিকেশনের গুণমানের ওপর নিবন্ধিত হবে। তবে ব্যাংকিং নথিতে ব্যক্তিগত উপার্জনের তথ্য, চিকিৎসার খরচ ও ব্যবসায়িক লেনদেনের মতো সংবেদনশীল তথ্য যুক্ত থাকায় তথ্য সুরক্ষার সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন নিশ্চিত করাও জরুরি বলে মনে করছেন একাংশ আইনি বিশেষজ্ঞ। অর্থমন্ত্রীর এই বিল পেশের মধ্য দিয়ে দেশের আইনি ও আর্থিক খাতের ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো।
Discover more from বাংলাকাল
Subscribe to get the latest posts sent to your email.

