নয়াদিল্লি, ১ আগস্ট: ভারতীয় বিচারব্যবস্থায় স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে সুপ্রিম কোর্টের কলিজিয়াম ব্যবস্থার সংস্কার এখন সময়ের দাবি। শীর্ষ আদালতের কলিজিয়াম যখন কোনো বিচারক নিয়োগ বা পদোন্নতির সিদ্ধান্ত নেয়, তখন সেই সিদ্ধান্তের নেপথ্যে থাকা যুক্তি বা কারণ স্পষ্টভাবে জনসমক্ষে প্রকাশ করা অত্যন্ত প্রয়োজন। এটি করা না হলে বিচারবিভাগীয় প্রক্রিয়ায় স্বৈরাচারিতা বা স্বেচ্ছাচারিতার ঝুঁকি থেকে যায়। সম্প্রতি ‘বিধি সেন্টার ফর লিগ্যাল পলিসি’-র এক বিশেষ অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে ঠিক এই সুরেই সওয়াল করলেন দেশের প্রবীণ আইনজীবী সৌরভ কৃপাল।
‘জুডিশিয়াল ট্রান্সপারেন্সি ইনডেক্স’ (Judicial Transparency Index)-এর উন্মোচন উপলক্ষে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে ভারতের বিচারব্যবস্থার অন্দরে স্বচ্ছতার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়। এই সূচকের মাধ্যমে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট এবং বিভিন্ন রাজ্যের হাইকোর্টগুলোর তথ্য প্রকাশের নীতি ও স্বচ্ছতার মাত্রা মূল্যায়ন করা হয়েছে। উক্ত অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সুপ্রিম কোর্টের বিশিষ্ট বিচারক বিচারপতি উজ্জ্বল ভুঁইয়া এবং বিশিষ্ট আইনজীবী ড. আদিত্য সোন্ধির মতো ব্যক্তিত্বরা।
প্রবীণ আইনজীবী সৌরভ কৃপাল তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট করেন যে, কলিজিয়ামের সিদ্ধান্তের পেছনে কারণ দর্শানো হলে তা কেবল বিচারব্যবস্থার নিরপেক্ষতাই বজায় রাখে না, বরং সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জনেও সাহায্য করে। তাঁর মতে, উপযুক্ত কারণ না জানিয়ে বিচারক পদে কারো নাম সুপারিশ বা বাতিল করা হলে, ভবিষ্যতে এই পদের জন্য সম্ভাব্য যোগ্য প্রার্থীদের মনে একটি ভয়ের পরিবেশ বা ‘চিলিং ইফেক্ট’ (Chilling Effect) তৈরি হয়। প্রার্থীরা অনেক সময়ই বুঝতে পারেন না কোন মানদণ্ডে তাঁদের বিচার করা হচ্ছে।
কৃপাল জোর দিয়ে বলেন, সিদ্ধান্তের সঠিক কারণ প্রকাশ করা হলে তা বিচার বিভাগের ওপর একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও কার্যকরী স্ব-নিয়ন্ত্রণকারী ব্যবস্থা (Check on the Judiciary) হিসেবে কাজ করে। এতে করে কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত পছন্দ- অপছন্দ বা গোপন কোনো মানদণ্ড নিয়োগ প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে না।
অনুষ্ঠানে বিচারকদের বদলি প্রক্রিয়ার অস্পষ্টতা নিয়েও তীব্র সমালোচনা করা হয়। সাধারণ মানদণ্ড ছাড়া হুটহাট বিচারকদের এক হাইকোর্ট থেকে অন্য হাইকোর্টে বদলি করার নীতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন উঠে আসছে। আলোচনায় উঠে আসে যে, বিচারকদের এই ধরনের গোপনীয় বদলি প্রক্রিয়া অনেক ক্ষেত্রে শাস্তিমূলক পদক্ষেপ অথবা নির্দিষ্ট কোনো পছন্দের বিচারককে সুবিধা দেওয়ার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। এটি বিচার বিভাগের স্বাধীন ভিত্তিকে দুর্বল করে দেয়।
বিশেষজ্ঞ প্যানেল উল্লেখ করে যে, বদলির নির্দিষ্ট ও বস্তুগত নীতি না থাকলে বিচারকরা নিজেদের স্বাধীন মত প্রকাশের ক্ষেত্রে বা সরকারের বিরুদ্ধে রায় দেওয়ার ক্ষেত্রে মানসিক চাপ অনুভব করতে পারেন। তাই বদলির ক্ষেত্রেও সম্পূর্ণ স্বচ্ছতা বজায় রাখা জরুরি।
বিচারবিভাগের সার্বিক দায়বদ্ধতা বাড়াতে কেবল নিয়োগ বা বদলিই নয়, বিচারকদের বিরুদ্ধে হওয়া শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগ এবং তদন্ত প্রক্রিয়াও জনসমক্ষে আনা উচিত বলে দাবি জানান আলোচকরা। তাঁরা বলেন, বিচারালয়ের প্রতি জনগণের আস্থা বজায় রাখতে হলে কোনো অভিযোগের তদন্ত প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ ঢেকে না রেখে তা প্রকাশ করা দরকার।
সমাপ্তি বক্তব্যে উপস্থিত আইন বিশেষজ্ঞ ও বক্তারা একমত হন যে, ভারতীয় বিচারব্যবস্থায় বস্তুনিষ্ঠতা ও আধুনিকতার ছোঁয়া আনতে গেলে কাঠামোগত সংস্কার অবধারিত। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা রক্ষার পাশাপাশি তার নিজস্ব স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতাও সমান গুরুত্ব পাওয়ার যোগ্য।
বাংলাকাল-কে ফলো করুন
Discover more from বাংলাকাল
Subscribe to get the latest posts sent to your email.

