রাঁচি, ১১ অগাস্ট:
ঝাড়খণ্ডে বিভিন্ন সরকারি নিয়োগ পরীক্ষায় ব্যাপক দুর্নীতি এবং অনিয়মের অভিযোগে দীর্ঘদিন ধরে চলা ছাত্র বিক্ষোভ এবার চরম আকার ধারণ করেছে। সোমবার ঝাড়খণ্ড বিধানসভা ঘেরাও করার উদ্দেশ্যে হাজার হাজার চাকরিপ্রার্থী এবং পড়ুয়া পথে নামলে পুলিশের সঙ্গে তাঁদের ব্যাপক খণ্ডযুদ্ধ বেধে যায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ জলকামান, কাঁদানে গ্যাস এবং বেধড়ক লাঠিচার্জ করে বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এই ঘটনায় বেশ কয়েকজন আন্দোলনকারী পড়ুয়া এবং কয়েকজন পুলিশ কর্মী গুরুতর আহত হয়েছেন। পুলিশের এই কঠোর পদক্ষেপের পর ঝাড়খণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেন আন্দোলনরত পড়ুয়াদের শান্ত থাকার আবেদন জানিয়েছেন এবং তাঁদের সমস্ত দাবিদাওয়া অত্যন্ত সংবেদনশীলতার সঙ্গে খতিয়ে দেখে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।
জেপিএসসি এবং জেএসএসসি রিফর্ম মোর্চার ডাকে হাজার হাজার চাকরিপ্রার্থী সোমবার রাঁচির পুরনো বিধানসভা ভবন থেকে নতুন বিধানসভা ভবনের দিকে বিশাল মিছিল করে এগোতে থাকেন। উল্লেখ্য, এদিন বিধানসভার বাদল অধিবেশন চলছিল এবং কাকতালীয়ভাবে দিনটি ছিল মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেনের একান্নতম জন্মদিন। আন্দোলনকারীদের মূল দাবি হলো, ঝাড়খণ্ড পাবলিক সার্ভিস কমিশন এবং ঝাড়খণ্ড স্টাফ সিলেকশন কমিশন পরিচালিত নিয়োগ পরীক্ষাগুলোতে যে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে, তার সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ সিবিআই তদন্ত করতে হবে এবং বিতর্কিত পরীক্ষাগুলো অবিলম্বে বাতিল করতে হবে। আন্দোলনকারীদের আটকাতে পুলিশ বিধানসভায় যাওয়ার রাস্তায় জগন্নাথপুর মন্দিরের কাছে একাধিক স্তরের মজবুত ব্যারিকেড তৈরি করেছিল। কিন্তু হাজার হাজার তরুণ-তরুণী জাতীয় পতাকা হাতে সেই ব্যারিকেড ভেঙে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশ তাঁদের বাধা দেয়।
আন্দোলনকারী পড়ুয়াদের অভিযোগ, তাঁরা সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণভাবে নিজেদের দাবি আদায়ের জন্য মিছিল করছিলেন, কিন্তু পুলিশ বিনা প্ররোচনায় তাঁদের ওপর বর্বরভাবে লাঠিচার্জ করে। অনেকের মাথা ফেটে যায় এবং রক্তাক্ত অবস্থায় তাঁদের উদ্ধার করে হাসপাতালে বা অ্যাম্বুলেন্সে নিয়ে যাওয়া হয়। পুলিশের জলকামান ছোঁড়া সত্ত্বেও অনেককে জাতীয় পতাকা হাতে ভিজতে ভিজতে প্রতিবাদী স্লোগান দিতে দেখা যায়। অন্যদিকে পুলিশের দাবি, বিক্ষোভকারীদের একটি ছোট অংশ হঠাৎ করেই হিংসাত্মক হয়ে ওঠে এবং পুলিশকে লক্ষ্য করে পাথর ছুঁড়তে শুরু করে। ব্যারিকেড ভেঙে সরকারি কাজে বাধা এবং বিশৃঙ্খলা তৈরি করার চেষ্টা হলে বাধ্য হয়েই পুলিশকে অত্যন্ত সীমিত সময়ের জন্য ন্যূনতম শক্তি প্রয়োগ করতে হয়।
এই চরম উত্তেজনার আবহে মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেন সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম এক্সে একটি বিস্তারিত খোলা চিঠি প্রকাশ করে পড়ুয়াদের উদ্দেশ্যে বার্তা দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন যে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় শান্তিপূর্ণভাবে নিজেদের দাবি তুলে ধরার পূর্ণ অধিকার সকলের রয়েছে এবং সরকার তাঁদের সেই কণ্ঠস্বরকে সম্মান করে। মুখ্যমন্ত্রী আশ্বাস দিয়েছেন যে, সরকার পড়ুয়াদের প্রতিটি দাবি অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করছে এবং দুর্নীতিগ্রস্ত কাউকেই রেয়াত করা হবে না। পরীক্ষা ব্যবস্থাকে আগামী দিনে আরও বেশি স্বচ্ছ, প্রযুক্তি-নির্ভর, দায়বদ্ধ এবং সুরক্ষিত করে তোলার জন্য সরকার বদ্ধপরিকর বলে তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন। পাশাপাশি, পরিস্থিতি অত্যন্ত সংযম ও সংবেদনশীলতার সঙ্গে মোকাবিলা করার জন্য তিনি নিরাপত্তা বাহিনীকে ধন্যবাদও জানিয়েছেন।
একইসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী রাজ্যের বিরোধী দলগুলোকে সরাসরি নিশানা করে বলেছেন, কিছু রাজনৈতিক স্বার্থান্বেষী মানুষ এই শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকে বিপথে চালিত করার চেষ্টা করছে। তিনি পড়ুয়াদের কাছে আবেদন রেখেছেন, তাঁরা যেন কোনো রাজনৈতিক ন্যারেটিভ বা ফাঁদে পা না দেন এবং আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধানের ওপর আস্থা রাখেন। রাজ্য সরকারের দাবি, তারা ইতিমধ্যেই আন্দোলনকারীদের আটানব্বই শতাংশ দাবি মেনে নিয়েছে। কিন্তু ছাত্র নেতারা সরকারের এই দাবি সম্পূর্ণ খারিজ করে দিয়েছেন।
আন্দোলনের অন্যতম প্রধান মুখ দেবেন্দ্র নাথ মাহাতো, যিনি নিয়োগে স্বচ্ছতার দাবিতে টানা নয় দিন ধরে অনশনে বসেছেন, তিনিও এদিন একটি অ্যাম্বুলেন্সে করে স্ট্রেচারে শুয়ে মিছিলের সামনে এসে উপস্থিত হন। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, পুলিশি অত্যাচার বা লাঠিচার্জ করে এই আন্দোলন থামানো যাবে না। ছাত্র নেতা রবীন্দ্র পাসোয়ান অভিযোগ করেছেন, সরকার তেরোটি পরীক্ষা বাতিলের দাবির মধ্যে মাত্র তিনটি বাতিল করেছে এবং সিবিআই তদন্তের বদলে রাজ্য পুলিশের সিআইডি দিয়ে তদন্ত করিয়ে আসল সত্য ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছে। সম্প্রতি এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট বা ইডি এই নিয়োগ দুর্নীতির অভিযোগে একটি আর্থিক তছরুপের মামলা দায়ের করে তদন্ত শুরু করেছে। সব মিলিয়ে প্রশাসনের কড়া নজরদারি এবং মুখ্যমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতির পরেও ঝাড়খণ্ডের পরিস্থিতি আপাতত থমথমে এবং আন্দোলনকারীরা তাঁদের দাবিতে অনড় রয়েছেন।
Discover more from বাংলাকাল
Subscribe to get the latest posts sent to your email.

