কলকাতা, ১১ অগাস্ট:
পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় মসজিদ, মাদ্রাসা এবং অন্যান্য ধর্মীয় স্থানগুলোতে পুলিশি সমীক্ষা পরিচালনার অভিযোগকে কেন্দ্র করে রাজ্যজুড়ে নতুন করে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। মানবাধিকার এবং নাগরিক অধিকার রক্ষায় সোচ্চার সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন ফর প্রোটেকশন অফ সিভিল রাইটস বা সংক্ষেপে এপিসিআর এই পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করেছে এবং রাজ্য সরকার ও পুলিশ প্রশাসনের কাছে এই সমীক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য নিয়ে দ্রুত এবং সুস্পষ্ট জবাব বা স্পষ্টীকরণ দাবি করেছে। স্বাধীন সংবাদমাধ্যম মাকতুব মিডিয়ার একটি বিস্তারিত প্রতিবেদনে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় স্থানগুলোতে পুলিশের এই আকস্মিক তথ্য সংগ্রহ অভিযানের বিষয়টি প্রকাশ্যে আনা হয়েছে। নাগরিক অধিকার কর্মীদের মতে, কোনো পূর্বঘোষণা বা স্পষ্ট সরকারি নির্দেশিকা ছাড়াই এই ধরনের সমীক্ষা সাধারণ মানুষের মধ্যে, বিশেষ করে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মনে গভীর আতঙ্ক এবং সংশয়ের জন্ম দিয়েছে।
মাকতুব মিডিয়ার প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিগত কয়েকদিন ধরে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে স্থানীয় থানাগুলোর পুলিশ আধিকারিকরা মসজিদ এবং মাদ্রাসাগুলোতে সরাসরি গিয়ে বিভিন্ন ধরনের তথ্য সংগ্রহ করছেন। অভিযোগ উঠেছে যে, পুলিশের পক্ষ থেকে ধর্মীয় স্থানগুলোর পরিচালনা কমিটির সদস্যদের নাম, সেখানে নিয়মিত কতজন মানুষ প্রার্থনা করতে আসেন, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর আয়ের উৎস কী এবং সেখানে কী ধরনের কার্যক্রম পরিচালিত হয়, সেই সংক্রান্ত পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ জানতে চাওয়া হচ্ছে। এপিসিআর-এর পক্ষ থেকে এই ধরনের পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদ এবং তথ্য সংগ্রহকে সম্পূর্ণ বেআইনি এবং অসাংবিধানিক বলে আখ্যা দেওয়া হয়েছে। সংগঠনের নেতৃত্ব প্রশ্ন তুলেছেন যে, পুলিশ প্রশাসন কোন আইনি ক্ষমতার বলে এবং কোন নির্দিষ্ট সরকারি নির্দেশের ভিত্তিতে একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের ধর্মীয় স্থানগুলোতে এই ধরনের নজরদারি বা সমীক্ষা চালাচ্ছে।
অ্যাসোসিয়েশন ফর প্রোটেকশন অফ সিভিল রাইটস-এর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন যে, এই ধরনের পদক্ষেপ সরাসরি ভারতীয় সংবিধানের ২৫ এবং ২৬ নম্বর অনুচ্ছেদে বর্ণিত ধর্মীয় স্বাধীনতার মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী। সংবিধানে দেশের প্রতিটি নাগরিককে নিজ নিজ ধর্ম পালন এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান পরিচালনার পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে। সেখানে কোনো ধরনের অপরাধমূলক অভিযোগ বা আইনি কারণ ছাড়াই শুধুমাত্র ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে পুলিশি নজরদারি চালানোকে ধর্মীয় স্বাধীনতার ওপর সরাসরি হস্তক্ষেপ বলে মনে করছে অধিকার রক্ষাকারী সংগঠনটি। এপিসিআর-এর রাজ্য কমিটির পক্ষ থেকে অবিলম্বে রাজ্য পুলিশের মহানির্দেশক বা ডিজিপি এবং রাজ্যের স্বরাষ্ট্র দপ্তরের কাছে একটি আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠিয়ে এই সমগ্র প্রক্রিয়ার আইনি বৈধতা সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়েছে।

ওই চিঠিতে এপিসিআর স্পষ্টভাবে দাবি করেছে যে, যদি রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে এই ধরনের কোনো সমীক্ষা করার আনুষ্ঠানিক নির্দেশিকা জারি করা হয়ে থাকে, তবে তা অবিলম্বে জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে। আর যদি স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন নিজেদের মর্জিমাফিক কোনো নির্দিষ্ট কারণ ছাড়াই এই ধরনের গোপন তথ্য সংগ্রহ অভিযান চালিয়ে থাকে, তবে তা অনতিবিলম্বে বন্ধ করার নির্দেশ দিতে হবে। নাগরিক অধিকার কর্মীদের মতে, পশ্চিমবঙ্গ সরকার সর্বদাই নিজেদের ধর্মনিরপেক্ষ এবং সংখ্যালঘু দরদী বলে দাবি করে থাকে। কিন্তু সেই রাজ্যেই খোদ পুলিশ প্রশাসনের দ্বারা সংখ্যালঘুদের ধর্মীয় স্থানগুলোতে এই ধরনের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রোফাইলিং বা তালিকাভুক্তির কাজ সরকারের সেই ধর্মনিরপেক্ষ ভাবমূর্তির সঙ্গে চরমভাবে সাংঘর্ষিক।
এই প্রসঙ্গে মানবাধিকার কর্মীরা আরও উল্লেখ করেছেন যে, অতীতেও দেশের বিভিন্ন রাজ্যে এই ধরনের ধর্মীয় স্থানগুলোতে সমীক্ষা বা তথ্য সংগ্রহের নামে নির্দিষ্ট একটি সম্প্রদায়কে হয়রানি করার একাধিক নজির রয়েছে। পুলিশ আধিকারিকরা অনেক ক্ষেত্রেই ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর জমির দলিল, নির্মাণের ছাড়পত্র এবং বিভিন্ন আইনি নথিপত্র দেখতে চাইছেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে। এই সমস্ত নথি যাচাই করার নামে সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষ এবং মাদ্রাসাগুলোর সঙ্গে যুক্ত শিক্ষকদের অযথা জিজ্ঞাসাবাদ করে মানসিক চাপে ফেলা হচ্ছে। এপিসিআর মনে করে যে, এই ধরনের পদক্ষেপ আইনশৃঙ্খলা রক্ষার নামে মূলত সংখ্যালঘুদের ওপর এক প্রকার মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টিরই শামিল। রাজ্যের যে সমস্ত এলাকায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের বসবাস বেশি, মূলত সেই এলাকাগুলোতেই এই ধরনের পুলিশি তৎপরতা সবথেকে বেশি চোখে পড়ছে।
এই ঘটনার পর রাজ্যের বিভিন্ন সংখ্যালঘু সংগঠন এবং সমাজকর্মীরাও পুলিশের এই আচরণের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে শুরু করেছেন। তাঁদের বক্তব্য, যেকোনো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রশাসনের কাজের স্বচ্ছতা থাকা অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে যখন বিষয়টি ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সঙ্গে যুক্ত, তখন প্রশাসনের যেকোনো গোপন পদক্ষেপ বা অস্পষ্ট নির্দেশিকা সমাজে অহেতুক ভুল বোঝাবুঝি এবং মেরুকরণের সৃষ্টি করতে পারে। মাকতুব মিডিয়ার প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখনো পর্যন্ত এই সমীক্ষার বিষয়ে সরকারিভাবে কোনো বিবৃতি বা ব্যাখ্যা প্রদান করা হয়নি। অবিলম্বে এই পুলিশি সমীক্ষার প্রকৃত কারণ ও নির্দেশিকা স্পষ্ট না করা হলে আগামী দিনে বৃহত্তর আইনি এবং গণতান্ত্রিক আন্দোলনের পথে হাঁটার হুঁশিয়ারি দিয়েছে এপিসিআর এবং অন্যান্য মানবাধিকার সংগঠনগুলো।
Discover more from বাংলাকাল
Subscribe to get the latest posts sent to your email.

