মন্ডলা (মধ্যপ্রদেশ), ৩১ জুলাই: সরকারি অ্যাম্বুলেন্সে জীবনদায়ী অক্সিজেনের সিলিন্ডার ফাঁকা! মা-বাবার চোখের সামনেই অক্সিজেনের মাস্ক মুখে ছটফট করতে করতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করল ২১ বছরের এক তরুণ। মধ্যপ্রদেশের মন্ডলা জেলায় ঘটে যাওয়া এই মর্মান্তিক ঘটনা ফের একবার রাজ্যের জরুরি স্বাস্থ্য পরিষেবার জরাজীর্ণ কঙ্কালসার চেহারাটাকে প্রকাশ্যে এনে ফেলল। সাংবাদিক শচীন গুপ্তার সমাজমাধ্যমে শেয়ার করা এক চরম বেদনাদায়ক ভিডিও ঘিরে ইতিমধ্যেই তীব্র শোরগোল পড়ে গিয়েছে সারা দেশে।
গত ২৭ জুলাই, ২০২৬ সালে মন্ডলা জেলার বাসিন্দা ২১ বছর বয়সী অজিত বারাইয়া নামের ওই কিডনি আক্রান্ত তরুণকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় জেলা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। ১০৮ সরকারি অ্যাম্বুলেন্সে তোলার পর পথেই তাঁর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হতে শুরু করে। কিন্তু অভিযোগ, অ্যাম্বুলেন্সে থাকা অক্সিজেন সিলিন্ডারটি ছিল সম্পূর্ণ খালি। সমাজমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা গিয়েছে, চলন্ত অ্যাম্বুলেন্সের ভেতরে বাবা-মা তাঁদের সন্তানকে শক্ত করে ধরে রয়েছেন। তরুণের মুখে অক্সিজেন মাস্ক লাগানো থাকলেও সিলিন্ডারের গেজ মিটারটি শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছিল। কোনো রকম অক্সিজেন না পেয়ে তীব্র শ্বাসকষ্টে ছটফট করতে করতেই মা-বাবার কোলেই প্রাণ হারায় তরুণ।
অজিতের পরিবারের তরফে অ্যাম্বুলেন্স কর্মীদের বিরুদ্ধে চরম গাফিলতি ও অবহেলার অভিযোগ তোলা হয়েছে। পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য, তরুণ আগে থেকেই জটিল কিডনির রোগে ভুগছিলেন এবং তাঁর জরুরি ভিত্তিতে অক্সিজেনের প্রয়োজন ছিল। সে কথা মাথায় রেখেই একটি সুসজ্জিত এবং পর্যাপ্ত অক্সিজেন সুবিধাযুক্ত অ্যাম্বুলেন্সের জন্য আবেদন জানানো হয়েছিল।
কিন্তু অভিযোগ, প্রথমত দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করার পর ১০৮ নম্বরের অ্যাম্বুলেন্সটি দেরিতে এসে পৌঁছায়। দ্বিতীয়ত, গাড়ি ছাড়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই সিলিন্ডারের অক্সিজেন শেষ হয়ে যায়। চালক বা উপস্থিত স্বাস্থ্যকর্মীরা গাড়ি ছাড়ার আগে সিলিন্ডারে পর্যাপ্ত অক্সিজেন রয়েছে কি না, তা পরীক্ষা করে দেখার প্রয়োজনটুকুও বোধ করেননি। ভিডিওতে স্পষ্ট দেখা গিয়েছে, সিলিন্ডারের মিটারটি একদম শূন্যে ঠেকে আছে এবং করুণভাবে নিজের শেষ মুহূর্তের সঙ্গে লড়াই করছেন ওই তরুণ। পরিবারের দাবি, সঠিক সময়ে অক্সিজেন পাওয়া গেলে আজ হয়তো তাঁদের সন্তানকে এভাবে অকালে প্রাণ হারাতে হতো না।
এই ঘটনা জানাজানি হতেই মধ্যপ্রদেশের সরকারি স্বাস্থ্য পরিষেবা এবং জরুরি অ্যাম্বুলেন্স ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ক্ষোভের আগুন জ্বলে উঠেছে। এই প্রথম নয়, মধ্যপ্রদেশে অ্যাম্বুলেন্সে পর্যাপ্ত অক্সিজেনের অভাবে রোগীর মৃত্যুর ঘটনা নতুন কিছু নয়। এর আগেও একাধিকবার রাজ্যজুড়ে অ্যাম্বুলেন্সে অক্সিজেন ঘাটতির কারণে মৃত্যুর ঘটনা সংবাদ শিরোনামে এসেছে। বারংবার এ জাতীয় মর্মান্তিক ঘটনা ঘটলেও যে প্রশাসন বা স্বাস্থ্য দপ্তর কোনো শিক্ষাই নেয়নি, মন্ডলার এই ঘটনাটি তা আরও একবার প্রমাণ করে দিল।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর আমজনতা থেকে শুরু করে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি শিবরাজ সরকারের স্বাস্থ্য পরিকাঠামোকে তীব্র আক্রমণ করেছে। জরুরি পরিষেবার এই বেহাল দশা কীভাবে একের পর এক তাজা প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
ঘটনার তীব্রতা উপলব্ধি করে নড়েচড়ে বসেছে মধ্যপ্রদেশের স্বাস্থ্য দপ্তর। রাজ্য স্বাস্থ্য বিভাগের আধিকারিকরা ঘটনাটির পূর্ণাঙ্গ তদন্তের আশ্বাস দিয়েছেন। জানানো হয়েছে, কোথায় গাফিলতি ছিল এবং অ্যাম্বুলেন্সের সিলিন্ডার কেন খালি ছিল, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। দোষী সাব্যস্ত হলে সংশ্লিষ্ট কর্মীদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে তদন্তের আশ্বাসের পাশাপাশি দায় এড়ানোর প্রবণতাও লক্ষ্য করা গিয়েছে। জেলা স্বাস্থ্য দপ্তরের প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায় বলা হয়েছে, কেন্দ্রীয় সরবরাহ ব্যবস্থা এবং লজিস্টিক সংক্রান্ত কিছু সমস্যার কারণে মাঝে মাঝে এমন জটিলতা তৈরি হয়। তবে এই ধরনের যুক্তি আক্রান্ত পরিবার বা ক্ষুব্ধ সাধারণ মানুষকে শান্ত করতে পারেনি। এক উদীয়মান যুবকের অকালমৃত্যু ফের প্রশ্ন তুলে দিল— সরকারি দপ্তরের এই ক্যাজুয়াল মানসিকতা আর কত নির্দোষের জীবন কাড়বে?
বাংলাকাল-কে ফলো করুন
Discover more from বাংলাকাল
Subscribe to get the latest posts sent to your email.

