জুরিখে, ৩১ জুলাই: বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ আসর বিশ্বকাপ কি এবার ইউরোপীয় দেশগুলোর অংশগ্রহণ ছাড়াই অনুষ্ঠিত হতে চলেছে? ফুটবলের বিশ্বসংস্থা ফিফা (FIFA) এবং ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ামক সংস্থা ইউয়েফা (UEFA)-র মধ্যে চরম বিরোধের জেরে তৈরি হয়েছে অভূতপূর্ব এই সংকট। ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর প্রস্তাবিত একটি বিতর্কিত বেসরকারি বিনিয়োগ পরিকল্পনাকে কেন্দ্র করে বিশ্ব ফুটবল অঙ্গন আজ কার্যত দুটি ভাগে বিভক্ত। ইউরোপীয় দেশগুলোর তীব্র প্রতিবাদ ও বয়কটের হুমকির মুখে পড়ে ফিফা সভাপতি তাঁর কঠোর অবস্থান থেকে খানিকটা নমনীয় হতে বাধ্য হয়েছেন বলে জানা গেছে।
সংকটের সূত্রপাত জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর এক গোপন ও বিতর্কিত বাণিজ্যিক পরিকল্পনাকে কেন্দ্র করে। বিশ্ব ফুটবলের ব্যবসায়িক কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং নতুন তহবিল সংগ্রহের লক্ষ্যে ফিফা ‘ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ’ (FFE) নামে ২০ বিলিয়ন ডলারের একটি সাবসিডিয়ারি সংস্থা গঠনের প্রস্তাব আনে। এই নতুন সংস্থার ২০ শতাংশ শেয়ার বা স্বত্ব বেসরকারি ইক্যুইটি বিনিয়োগকারীদের (Private Equity Investors) কাছে বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নেন ইনফান্তিনো।
বিশ্বকাপের মতো ঐতিহ্যবাহী ও মর্যাদাপূর্ণ প্রতিযোগিতার মালিকানা বা ব্যবসায়িক অংশীদারিত্ব বেসরকারি পুঁজি ও কোটিপতি বিনিয়োগকারীদের হাতে তুলে দেওয়ার এই পদক্ষেপকে কেন্দ্র করেই ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটে। ফিফার তরফে যুক্তি দেওয়া হয়েছিল যে, এই বিনিয়োগের ফলে প্রায় ৪.২ বিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত অর্থ উঠে আসবে, যা বিশ্বজুড়ে ফুটবলের উন্নয়নে সাহায্য করবে। এমন সিদ্ধান্ত সমর্থনে সদস্য দেশগুলোকে ৪০ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত অনুদানের প্রলোভনও দেওয়া হয় বলে বিভিন্ন সংবাদ সূত্রে দাবি করা হয়েছে।
ফিফার এই প্রাইভেটাইজেশন বা স্বত্ব বিক্রির চেষ্টার খবর প্রকাশ্যে আসতেই তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায় ইউরোপের ফুটবল সংস্থা ইউয়েফা। জরুরি ভিত্তিতে ইউয়েফার ৫৫টি সদস্য দেশের প্রতিনিধিদের নিয়ে প্রায় দু’ঘণ্টাব্যাপী একটি ভার্চুয়াল সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভাশেষে ইউরোপীয় ফুটবলের প্রধানরা একজোট হয়ে জানিয়ে দেন যে, তাঁরা সর্বসম্মতভাবে ফিফার এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করছেন।
ইউয়েফা তাদের আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে স্পষ্ট করে জানিয়েছে, “বিশ্বকাপ কোনো সাধারণ বিনিয়োগের পণ্য বা বিক্রয়যোগ্য বস্তু হতে পারে না। এটি ফুটবলের অন্যতম সেরা ঐতিহ্য যা কয়েক প্রজন্ম ধরে গড়ে উঠেছে। কোনো অবস্থাতেই এর অংশীদারিত্ব বেসরকারি সংস্থাকে দেওয়া যাবে না। বিশ্বকাপ বিক্রির জন্য নয়।”
সবচেয়ে বড় ঘোষণাটি আসে বয়কটের বিষয়ে। ইউয়েফা ঘোষণা করে যে, ফিফা যদি তাদের এই সিদ্ধান্ত থেকে সম্পূর্ণরূপে সরে না আসে এবং ভবিষ্যতে এমন কোনো চেষ্টা না করার লিখিত প্রতিশ্রুতি না দেয়, তবে ইউরোপের কোনো দেশ পুরুষদের বিশ্বকাপ, নারী বিশ্বকাপ বা ক্লাব বিশ্বকাপসহ ফিফার পরিচালিত কোনো প্রতিযোগিতায় অংশ নেবে না। এমনকি ইউরোপের অনেক দেশের সরকার ও ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীও ইউয়েফার এই নীতিগত সিদ্ধান্তকে পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছেন।
ইউরোপের শক্তিশালী ফুটবল শক্তিগুলি একসাথে টুর্নামেন্ট বয়কটের হুঁশিয়ারি দেওয়ায় বড় ধরনের চাপের মুখে পড়েছেন জিয়ান্নি ইনফান্তিনো। ফিফা সভাপতির বিরুদ্ধে ইতিমধ্যেই বিশ্ব ফুটবলের ভাবমূর্তি নষ্টের অভিযোগ উঠেছে। এরপরই সুইজারল্যান্ডের জুরিখ থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে ইনফান্তিনো তাঁর অবস্থান কিছুটা নমনীয় করেন।
ইনফান্তিনো এখন পুরো বিষয়টিকে বাধ্যতামূলক কোনো সিদ্ধান্ত নয়, বরং একটি ‘গণতান্ত্রিক প্রস্তাব’ বা আলোচনা প্রক্রিয়া হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছেন। তিনি জানান, “এফএফই (FFE) একটি প্রস্তাবমাত্র। এটি বিশ্বজুড়ে আলোচনার জন্য রাখা হয়েছে। এটি কোনো বাধ্যবাধকতা নয়। ফিফার ২১১টি সদস্য দেশ এবং ফিফা কাউন্সিল যদি সম্মতি দেয়, তবেই এই বিষয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”
যদি ইউয়েফা সত্যিই বিশ্বকাপে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্তে অনড় থাকে, তবে বিশ্বকাপ ফুটবল তার সমস্ত গ্ল্যামার ও আকর্ষণ হারিয়ে ফেলবে। স্পেন, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স বা জার্মানির মতো পরাশক্তি ছাড়া ফুটবল বিশ্বকাপের কল্পনাও অসম্ভব। উত্তর আমেরিকার কনকাকাফ (CONCACAF)-ও এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছে। সে ক্ষেত্রে ইনফান্তিনোকে হয়তো আগামী ১৯ সেপ্টেম্বরের মধ্যে এই পরিকল্পনা সম্পূর্ণ গুটিয়ে নিতে বাধ্য হতে হবে। বিশ্ব ফুটবলের প্রশাসনিক ইতিহাসে এমন সংকট নিকট অতীতে দেখা যায়নি।
বাংলাকাল-কে ফলো করুন
Discover more from বাংলাকাল
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
