লখনউ, ০৪ আগস্ট:বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পরবর্তী সামাজিক অস্থিরতা ও উত্তেজনার আবহ থেকে উদ্ভূত ৩৩ বছরের পুরনো এক দেশদ্রোহের মামলায় ৭৮ বছরের বৃদ্ধ মুহাম্মদ নঈমকে সম্পূর্ণরূপে বেকসুর খালাস দিল লখনউয়ের বিশেষ এনআইএ আদালত। দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা এই দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর আদালত স্পষ্টভাবে জানায় যে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ ও সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ছড়ানোর কোনো উপযুক্ত এবং নির্ভরযোগ্য প্রমাণ জমা দিতে ব্যর্থ হয়েছে প্রসিকিউশন। অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা বিচারক তথা বিশেষ এনআইএ বিচারক উমাকান্ত জিন্দাল গত ৩১ জুলাই এই ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেন। ভারতীয় দণ্ডবিধির ১২৪এ (দেশদ্রোহ), ২৯৫এ (ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত) এবং ১৫৩বি (জাতীয় সংহতি বিরোধী বক্তব্য) ধারায় অভিযুক্ত গোরক্ষপুরের বাসিন্দা নঈমকে সমস্ত অভিযোগ থেকে মুক্ত করে আদালত।
মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ১৯৯৩ সালের ২৬ জানুয়ারি বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পরপরই গোরক্ষপুরের ইসমাইলপুর এলাকায় সাধারণ প্রজাতন্ত্র দিবসের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা পুলিশ আধিকারিকরা দাবি করেন যে কয়েকজন ব্যক্তি বাড়ির ছাদ থেকে কালো পতাকা দেখাচ্ছে এবং ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ ও ‘গণতন্ত্র দিবস মুর্দাবাদ’-এর মতো রাষ্ট্রবিরোধী স্লোগান দিচ্ছে। পুলিশের পক্ষ থেকে কোতোয়ালি থানায় এফআইআর দায়ের করে দাবি করা হয়েছিল যে অভিযুক্তরা ভারতে আরেকটি পাকিস্তান গড়ার দাবি তুলেছিল এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের চেষ্টা করেছিল। তবে ঘটনার সময় পুলিশ পৌঁছানোর আগেই অভিযুক্তরা পালিয়ে যায় বলে দাবি করা হয় এবং ঘটনাস্থল থেকে চারটি কালো পতাকা উদ্ধারের কথা বলা হয়েছিল। পরবর্তীতে এই ঘটনায় মুহাম্মদ নঈম, মোহাম্মদ ইউসুফ এবং আতাউল্লাহর বিরুদ্ধে মামলা নথিভুক্ত করে গোরক্ষপুর পুলিশ।
দীর্ঘ ৩৩ বছরের আইনি প্রক্রিয়ায় প্রসিকিউশনের জমা দেওয়া সাক্ষ্য-প্রমাণে একাধিক বড় ধরনের ত্রুটি ও অসঙ্গতি দেখতে পায় বিশেষ এনআইএ আদালত। তদন্তকারী কর্মকর্তারা আদালতে স্বীকার করেন যে অভিযুক্তরা পালিয়ে যাওয়ার পর কে পুলিশকে তাদের পরিচয় বা নাম জানিয়েছিল, তার কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রসিকিউশন দিতে পারেনি। অধিকন্তু, ঘটনার স্থান থেকে যে চারটি কালো পতাকা বাজেয়াপ্ত করার দাবি করা হয়েছিল, তা আদালতে কখনোই উপস্থাপন করা সম্ভব হয়নি। এমনকি বাজেয়াপ্তকরণের কোনো সঠিক তালিকাও আদালতে পেশ করতে ব্যর্থ হয় পুলিশ। ২০০৩ সালে প্রথম তদন্তকারী কর্মকর্তা প্রমাণের অভাবে মামলাটি নিষ্পত্তির জন্য রিপোর্ট জমা দিলেও পরবর্তীতে অন্য এক তদন্তকারী কর্মকর্তা কোনো নতুন প্রমাণ সংগ্রহ না করেই ২০০৫ সালে চার্জশিট দাখিল করেছিলেন, যা আদালত খারিজ করে দেয়।
বিচার চলাকালীনই সহ-অভিযুক্ত মোহাম্মদ ইউসুফ এবং আতাউল্লাহর মৃত্যু হলে এককভাবে নঈমের বিরুদ্ধে বিচার কাজ চলতে থাকে। এনআইএ আইনের আওতায় পরবর্তীতে মামলাটি গোরক্ষপুর থেকে লখনউয়ের এনআইএ বিশেষ আদালতে স্থানান্তরিত হয়। সব শুনানি শেষে বিচারক উমাকান্ত জিন্দাল রায়ে উল্লেখ করেন যে যুক্তিসঙ্গত সন্দেহের ঊর্ধ্বে উঠে অভিযোগ প্রমাণ করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে রাষ্ট্রপক্ষ। আদালতের রায়ের পর দীর্ঘ ৩৩ বছরের গ্লানি মুছে যাওয়ায় আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন ৭৮ বছর বয়সী বৃদ্ধ মুহাম্মদ নঈম। নির্দোষ প্রমাণিত হয়ে তিনি জানান যে দীর্ঘদিন ধরে তাঁকে দেশবিরোধী তকমা সহ্য করতে হয়েছে, অবশেষে বিচারব্যবস্থা তাঁর জীবনের সত্যতা ও সম্মান ফিরিয়ে দিল।
Discover more from বাংলাকাল
Subscribe to get the latest posts sent to your email.

