নয়াদিল্লি, ১৬ আগস্ট:
দেশের সাধারণ মানুষের মৌলিক সমস্যা এবং বাস্তব অগ্রাধিকারগুলির সঙ্গে সমকালীন রাজনীতি ও সংবাদমাধ্যমের প্রচারের ফারাক নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করলেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও সমাজকর্মী অভিনয় শর্মা (অভিনয় ম্যাথস)। তাঁর মতে, দেশের সাধারণ নাগরিকরা যখন শিক্ষা, উন্নত স্বাস্থ্যব্যবস্থা, কর্মসংস্থান, অনিয়ন্ত্রিত মূল্যবৃদ্ধি, দারিদ্র্য, প্রশ্নপত্র ফাঁস, কৃষকদের ন্যায্য আয়, নারী নিরাপত্তা, বিশুদ্ধ পানীয় জল, দূষণমুক্ত বায়ু এবং মজবুত পরিকাঠামোর মতো অতি জরুরি বিষয়গুলির সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করছেন, তখন রাজনৈতিক দলগুলি এবং সংবাদমাধ্যমের অগ্রাধিকার সম্পূর্ণ ভিন্ন খাতে প্রবাহিত হচ্ছে। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে সরাসরি জড়িত এই বাস্তব বিষয়গুলি আমাদের জাতীয় রাজনৈতিক আলোচনার মূল চালিকাশক্তি হতে পারছে না বলে তিনি স্পষ্ট অভিযোগ করেছেন।
শিক্ষক অভিনয় শর্মা তাঁর বক্তব্যে তুলে ধরেছেন যে, দেশের তরুণ সমাজ ও সাধারণ নাগরিকরা যখন উজ্জ্বল ভবিষ্যতের প্রত্যাশায় কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হচ্ছেন, তখন শাসকদলের পক্ষ থেকে জাতীয়তাবাদ, পাকিস্তান সংক্রান্ত বয়ান এবং অতীত ইতিহাস বা ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বদের সমালোচনার ওপর বেশি গুরুত্ব আরোপ করা হচ্ছে। অথচ সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো ভালো মানের শিক্ষা এবং সাধ্যের মধ্যে আধুনিক চিকিৎসাসেবা লাভ করা। দেশের যুবসমাজের প্রধান সংকট কর্মসংস্থানের অভাব এবং বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক সরকারি চাকরির পরীক্ষায় একের পর এক প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা। এসব প্রশাসনিক ব্যর্থতার কারণে লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ অন্ধকারের মুখে পড়ছে। এর পাশাপাশি অনিয়ন্ত্রিত মূল্যবৃদ্ধির চাপে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারগুলির জীবনযাপন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। দেশে দারিদ্র্য দূরীকরণ, কৃষকদের ফসলের সঠিক দাম ও আয় বৃদ্ধি, সমাজে নারীর সার্বিক নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা এবং বিশুদ্ধ প্রাকৃতিক সম্পদ নিশ্চিত করার মতো বিষয়গুলি প্রশাসনিক মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা উচিত ছিল।
অন্যদিকে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলির ভূমিকার সমালোচনা করে তিনি উল্লেখ করেছেন যে, তারা জনগণের বাস্তব সংকটগুলিকে সামনে রেখে জোরালো বিকল্প গড়ে তোলার পরিবর্তে নির্বাচনী কারচুপি, ইভিএম বিতর্ক, ভোট চুরি, জাতগণনা বা শুধুমাত্র সরকার পরিবর্তনের মতো ইস্যুগুলিতেই নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখছে। সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন যন্ত্রণার চেয়ে ক্ষমতা দখলের রাজনৈতিক কৌশল ও বিতর্কিত প্রাতিষ্ঠানিক আলোচনাই তাদের প্রধান কর্মসূচিতে পরিণত হয়েছে। ফলে দেশের আমজনতার মৌলিক দাবি ও অভাব-অভিযোগের সঠিক প্রতিফলন বিরোধী শিবিরেও স্পষ্ট হয়ে উঠছে না।
একই সঙ্গে দেশের মূলধারার সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা নিয়েও তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অভিনয় শর্মা। তিনি অভিযোগ করেন, সংবাদমাধ্যমগুলি জনসাধারণের স্বার্থে শিক্ষা, স্বাস্থ্য বা কর্মসংস্থানের মতো গভীর সমস্যাগুলি নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ও অর্থবহ বিতর্ক করার পরিবর্তে সস্তা চমক ও চাঞ্চল্যকর বিষয়গুলিতেই সবচেয়ে বেশি সময় ব্যয় করছে। সীমা হায়দারের মতো ব্যক্তিগত বিতর্ক, নরেন্দ্র মোদীর সোশ্যাল মিডিয়া রিলস এবং নিরন্তর হিন্দু-মুসলিম মেরুকরণের মতো আবেগপ্রবণ ইস্যুগুলি দেখিয়ে মূল সমস্যাগুলি থেকে দৃষ্টি ঘুরিয়ে রাখা হচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ জনস্বার্থের বিষয়গুলিকে আড়ালে রেখে দর্শক টানার জন্য এই ধরনের অপ্রয়োজনীয় ও তুচ্ছ বিষয়গুলিকে সামনে আনা হচ্ছে।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সক্রিয় সমালোচক হিসেবে অভিনয় শর্মা যুক্তি দেন যে, সাধারণ নাগরিকদের এই দৈনন্দিন বঞ্চনা ও মৌলিক সমস্যাগুলি কখনোই রাজনৈতিক দলগুলির মূল নির্বাচনী বা শাসন সংক্রান্ত এজেন্ডা হয়ে ওঠে না। সমাজমাধ্যমে তাঁর এই বক্তব্য প্রকাশের পরপরই তা ব্যাপক সাড়া ফেলেছে এবং শত শত মানুষ তাঁর এই বাস্তবমুখী মূল্যায়নের সঙ্গে সহমত পোষণ করেছেন। দেশের রাজনীতি, প্রশাসন এবং সংবাদমাধ্যমের এই অগ্রাধিকারহীনতাকে নিশানা করে তিনি আহ্বান জানান যাতে দ্রুত জনস্বার্থের প্রকৃত সমস্যাগুলিকে জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ফিরিয়ে আনা হয়।
Discover more from বাংলাকাল
Subscribe to get the latest posts sent to your email.

