ডলারের বিপরীতে রেকর্ড পতনের আশঙ্কা: টাকার দর ধরে রাখতে এক দিনেই ৭ বিলিয়ন ডলার বেচল আরবিআই

ডলারের বিপরীতে রেকর্ড পতনের আশঙ্কা: টাকার দর ধরে রাখতে এক দিনেই ৭ বিলিয়ন ডলার বেচল আরবিআই

মুম্বই, ৩১ জুলাই: আন্তর্জাতিক বাজারে অশোধিত খনিজের উচ্চ মূল্য, মূলধন প্রত্যাহার এবং বাজারভিত্তিক বহুমুখী চাপের মুখে পড়ে ডলারের বিপরীতে ভারতীয় মুদ্রার লাগাতার পতন রোধে নজিরবিহীন পদক্ষেপ করল দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বুমবার্গ (Bloomberg)-এর একটি চাঞ্চল্যকর রিপোর্ট অনুযায়ী, মার্কিন ডলারের বিপরীতে ভারতীয় টাকার মান সর্বকালের সর্বনিম্ন ৯৬ থেকে ৯৭ টাকা ছোঁয়ার কাছাকাছি পৌঁছাতেই বিশাল অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা বা ফরেক্স ফান্ড বাজারে ঢেলেছে রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া (RBI)। টাকার ঐতিহাসিক পতন ঠেকাতে তারা মাত্র একদিনেই বাজার থেকে প্রায় ৭ বিলিয়ন (৭০০ কোটি) মার্কিন ডলার বিক্রি করেছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে ভারতীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এটি অন্যতম বৃহৎ প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপ বলে মনে করা হচ্ছে।

প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, চলতি জুলাই মাসেই ডলারের তুলনায় ভারতীয় মুদ্রার মান প্রায় ২ শতাংশ হ্রাস পেয়েছিল। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং অনাবাসী ভারতীয় ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের বাজার থেকে অর্থ তুলে নেওয়ার ফলেই ভারতীয় রুপির ওপর এই বিপুল চাপ তৈরি হয়। এর আগে পরিস্থিতি সামাল দিতে মে মাসেও নিট ৬ বিলিয়ন ডলার বিক্রি করতে হয়েছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংককে। তবে এবারের হস্তক্ষেপের গতি ও পরিমাণ পূর্বের সমস্ত রেকর্ডকে পেছনে ফেলে দিয়েছে।

বাজার বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের মতে, কেবল দেশের অভ্যন্তরীণ (Onshore) বাজারেই নয়, বরং আন্তর্জাতিক তথা অফশোর (Offshore) ফরেক্স মার্কেটগুলোতেও সমান্তরালভাবে সক্রিয় হয়ে উঠেছিল আরবিআই। ডলারের অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধি আটকাতে রিজার্ভ ব্যাংক সরাসরি ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রচুর পরিমাণে মার্কিন মুদ্রা বাজারে সরবরাহ বা বিক্রি শুরু করে।

পরপর কয়েক দিনের এই জোরদার হস্তক্ষেপের ফলে টাকার দ্রুত অবমূল্যায়নে সাময়িকভাবে লাগাম টানা সম্ভব হয়েছে। ফলস্বরূপ, রুপির মান রেকর্ড পতন থেকে পুনরুদ্ধার হয়ে কিছুটা স্থিতিশীল পর্যায়ে পৌঁছাতে সক্ষম হয়। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক টাকার অবমূল্যায়নকে সম্পূর্ণরূপে রোধ করতে না চাইলেও, এর পতন যাতে নিয়ন্ত্রিত এবং সুসংহত উপায়ে হয়—সেই বিষয়টিকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিচ্ছে।

আরবিআইয়ের এই আগ্রাসী পদক্ষেপের পেছনে দেশের শক্তিশালী বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চয় বা ফরেক্স রিজার্ভ মূল হাতিয়ার হিসেবে কাজ করছে। সাম্প্রতিক হিসাব অনুযায়ী, দেশের ফরেক্স রিজার্ভ প্রায় ৬৭৬.২ বিলিয়ন ডলারের শক্তিশালী স্তরে অবস্থান করছে, যা আরবিআইকে টাকার মান রক্ষায় পর্যাপ্ত আইনি ও আর্থিক শক্তি জোগাচ্ছে।

এছাড়া, বিভিন্ন আমানত ও অনাবাসী তহবিলের মাধ্যমে প্রায় ৩২ বিলিয়ন ডলার মূল্যের বৈদেশিক মূলধন দেশে আনা সম্ভব হওয়ায় ব্যাংকটির হাতে এখন বিকল্প অস্ত্রের অভাব নেই। রিজার্ভ ব্যাংকের মূল উদ্দেশ্য হলো অস্থিরতার সুযোগে ফটকাবাজ বা স্পেকুলেটররা যাতে ভারতীয় মুদ্রার মান কৃত্রিমভাবে কমিয়ে দিতে না পারে। আগামী দিনেও যদি আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম আরও বৃদ্ধি পায় বা বিশ্ব অর্থনীতিতে টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়, তবে আরবিআই যে আবার একই ধরনের পদক্ষেপ নিতে পিছপা হবে না, এই বিপুল ডলার বিক্রির ঘটনাই তার স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়।

বাংলাকাল-কে ফলো করুন

Facebook Comments Box

Discover more from বাংলাকাল

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Leave a Comment

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply