কংগ্রেস আমলে বাড়িতে জাতীয় পতাকা উত্তোলনে বাধা ছিল, মোদী সেই অধিকার দিয়েছেন: দাবি যোগী আদিত্যনাথের

কংগ্রেস আমলে বাড়িতে জাতীয় পতাকা উত্তোলনে বাধা ছিল, মোদী সেই অধিকার দিয়েছেন: দাবি যোগী আদিত্যনাথের

লখনউ, ১১ অগাস্ট:

ভারতের প্রাক্তন সরকার অর্থাৎ কংগ্রেসের শাসনকালে দেশের সাধারণ নাগরিকদের নিজেদের বাড়িতে সসম্মানে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করতে গেলে রীতিমতো সংগ্রাম করতে হত। কিন্তু বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বাধীন সরকার দেশের ১৪০ কোটি ভারতীয় নাগরিককে সেই বহু প্রতীক্ষিত স্বাধীনতা এবং অধিকার প্রদান করেছে। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি ভিডিও বার্তার সাহায্যে দেশবাসীর উদ্দেশ্যে ভাষণ দিতে গিয়ে উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ এমনই এক জোরালো দাবি করেছেন। তাঁর এই ভাষণের ভিডিওটি প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই জাতীয় রাজনীতিতে নতুন করে বিতর্ক এবং আলোচনা শুরু হয়েছে। ২০২৬ সালের স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে আয়োজিত বহু চর্চিত হর ঘর তেরঙ্গা কর্মসূচির প্রচারের অংশ হিসেবেই উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী এই রাজনৈতিক দাবি করেছেন। তবে তাঁর এই দাবির সঙ্গে দেশের আইনি এবং ঐতিহাসিক নথিপত্রের কতটা সাযুজ্য রয়েছে, তা নিয়ে ইতিমধ্যেই বিভিন্ন ওয়াকিবহাল মহলে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।

ঐতিহাসিক তথ্য এবং সাংবিধানিক নথিপত্র অবশ্য উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রীর এই রাজনৈতিক দাবিকে সম্পূর্ণরূপে সমর্থন করে না। এটা ঠিক যে, ভারতের স্বাধীনতার পর থেকে দীর্ঘকাল সাধারণ নাগরিকদের প্রতিদিন নিজেদের বাড়িতে বা ব্যক্তিগত মালিকানাধীন কোনো প্রতিষ্ঠানে জাতীয় পতাকা উত্তোলনের ওপর বেশ কিছু কঠোর সরকারি বিধিনিষেধ আরোপ করা ছিল। কিন্তু এই আইনি বিধিনিষেধ বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর আমলে বা ২০১৪ সালের পরে প্রত্যাহার করা হয়নি। বরং পূর্বতন প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত অটল বিহারী বাজপেয়ীর নেতৃত্বাধীন জাতীয় গণতান্ত্রিক জোট বা এনডিএ সরকারের আমলেই সাধারণ মানুষকে এই বিশেষ স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছিল। ২০০২ সালে ফ্ল্যাগ কোড অফ ইন্ডিয়া বা ভারতের পতাকা বিধিতে একটি ঐতিহাসিক সংশোধন আনা হয়। সেই সংশোধনের মাধ্যমেই দেশের সাধারণ নাগরিকদের পূর্ণ মর্যাদার সঙ্গে এবং নিয়ম মেনে বছরের যেকোনো দিন নিজেদের বাড়িতে জাতীয় পতাকা উত্তোলনের অবাধ অধিকার প্রদান করা হয়।

দেশের সাধারণ নাগরিকদের এই অধিকার পাওয়ার নেপথ্যে একটি দীর্ঘ এবং তাৎপর্যপূর্ণ আইনি লড়াই জড়িয়ে রয়েছে। শিল্পপতি এবং প্রাক্তন সাংসদ নবীন জিন্দাল ব্যক্তিগত উদ্যোগে সসম্মানে জাতীয় পতাকা উত্তোলনের অধিকার চেয়ে দীর্ঘ আইনি লড়াই শুরু করেছিলেন এবং সরাসরি আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিলেন। তাঁর সেই সুদীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পর ভারতের সুপ্রিম কোর্ট একটি ঐতিহাসিক এবং যুগান্তকারী রায়ে স্পষ্ট জানিয়ে দেয় যে, সসম্মানে এবং মর্যাদার সঙ্গে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা দেশের প্রতিটি নাগরিকের একটি অন্যতম মৌলিক অধিকার। সুপ্রিম কোর্টের সেই গুরুত্বপূর্ণ রায়ের ভিত্তিতেই ২০০২ সালে তৎকালীন অটল বিহারী বাজপেয়ী সরকার দেশের পতাকা বিধিতে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনতে বাধ্য হয়। ফলস্বরূপ, বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর আমলে এই অধিকার প্রথমবার অর্জিত হয়েছে বলে উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যে দাবি করেছেন, তা ঐতিহাসিক তথ্যের নিরিখে একেবারেই সঠিক নয় বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

যোগী আদিত্যনাথের এই মন্তব্য এমন এক সময়ে সামনে এসেছে যখন সমগ্র দেশজুড়ে ২০২৬ সালের হর ঘর তেরঙ্গা কর্মসূচির ব্যাপক এবং সাড়ম্বর প্রস্তুতি চলছে। সরকারি নির্দেশিকা অনুযায়ী, আগামী ৯ অগাস্ট থেকে শুরু করে ১৭ অগাস্ট পর্যন্ত সমগ্র দেশজুড়ে এই বিশেষ জাতীয় প্রচার অভিযান চলবে। এবারের স্বাধীনতা দিবস এবং ভারতের জাতীয় স্তোত্র বন্দে মাতরম গানের সার্ধশতবার্ষিকী অর্থাৎ দেড়শো বছর পূর্তি উপলক্ষে দেশবাসীকে গণহারে নিজেদের বাড়িতে জাতীয় পতাকা উত্তোলনের জন্য উদাত্ত আহ্বান জানানো হয়েছে সরকারের পক্ষ থেকে। একইসঙ্গে সূর্যপথ তেরঙ্গার মতো বিভিন্ন অভিনব আন্তর্জাতিক উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। দেশজুড়ে ব্যাপকভাবে বন্দে মাতরম গাওয়ার মাধ্যমে এবং জাতীয় পতাকা উত্তোলনের মধ্যে দিয়ে এবারের স্বাধীনতা দিবসকে এক অনন্য মাত্রায় পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে সরকার। দেশজুড়ে চলা এই দেশাত্মবোধক আবহের মধ্যেই উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রীর জাতীয় পতাকা উত্তোলন সংক্রান্ত এই মন্তব্য নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

বাংলাকাল-কে ফলো করুন

Facebook Comments Box

Discover more from বাংলাকাল

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Leave a Comment

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply