রামপুরহাট, ১৬ আগস্ট:
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার প্রাক্তন ডেপুটি স্পিকার তথা প্রবীণ তৃণমূল কংগ্রেস নেতা আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের আকস্মিক ও রহস্যজনক মৃত্যু। রবিবার সকালে বীরভূম জেলার রামপুরহাটে দলের একটি কার্যালয় থেকে এই প্রবীণ রাজনীতিকের ঝুলন্ত মৃতদেহ উদ্ধার করা হয় বলে পুলিশ সূত্রে জানানো হয়েছে। এই দুর্ভাগ্যজনক ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পরপরই গোটা রাজ্যে এবং রাজ্য রাজনীতিতে ব্যাপক আলোড়নের সৃষ্টি হয়েছে। পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে অনুমান করা হচ্ছে যে এটি একটি আত্মহত্যার ঘটনা। মৃতের বাসভবনের ঠিক কাছে অবস্থিত ওই দলীয় কার্যালয় থেকে একটি সুইসাইড নোটও উদ্ধার করা হয়েছে। পুলিশ গোটা ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে।
পারিবারিক এবং স্থানীয় সূত্রে পাওয়া খবর অনুযায়ী, শনিবার রাতেও সব কিছু একদম স্বাভাবিক ছিল। মধ্যরাত পর্যন্ত আশিস বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সঙ্গে অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে কথাবার্তা বলেছিলেন। কথোপকথনের পর প্রতিদিনের মতোই তিনি নিজের ঘরে ঘুমাতে যান। কিন্তু রবিবার সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর পরিবারের সদস্য এবং প্রতিবেশীরা আচমকাই লক্ষ্য করেন যে, তাঁর ঘরের ঠিক পাশেই অবস্থিত অফিস ঘরের দরজাটি ভেতর থেকে সম্পূর্ণ বন্ধ অবস্থায় রয়েছে। অনেকক্ষণ ধরে ডাকাডাকি করার পরেও ভেতর থেকে কোনো সাড়া না মেলায় স্বভাবতই উপস্থিত সকলের মনে সন্দেহের দানা বাঁধে। এরপর তাঁরা জানলার একটি সামান্য ফাঁক দিয়ে ঘরের ভেতরে উঁকি মারতেই ওই বর্ষীয়ান তৃণমূল নেতার ঝুলন্ত দেহ দেখতে পান। মুহূর্তে সেখানে আতঙ্ক এবং কান্নার রোল পড়ে যায়। তাঁরা তৎক্ষণাৎ বুঝতে পারেন যে ঠিক কী মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটে গিয়েছে।
এরপর আর কোনো সময় নষ্ট না করে খবর দেওয়া হয় স্থানীয় থানায়। ঘটনার খবর পাওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই রামপুরহাট থানার পুলিশ বাহিনী দ্রুত ওই দলীয় কার্যালয়ে এসে পৌঁছায়। পুলিশ গিয়ে ঘরের দরজা ভেঙে মৃতদেহটি উদ্ধার করে। ইতিমধ্যেই প্রাক্তন এই তৃণমূল বিধায়কের মৃতদেহটি ময়নাতদন্তের জন্য স্থানীয় হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। তবে ঠিক কী কারণে এবং কোন পরিস্থিতিতে এমন একজন অভিজ্ঞ এবং প্রভাবশালী নেতা এই চরম পথ বেছে নিলেন, তা এখনও পর্যন্ত পুলিশের কাছে পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। পুলিশ আধিকারিকরা জানিয়েছেন, ময়নাতদন্তের চূড়ান্ত রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পর এবং উদ্ধার হওয়া সেই তথাকথিত সুইসাইড নোটটির বিষয়বস্তু বিস্তারিতভাবে খতিয়ে দেখার পরই তাঁর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং পরিস্থিতি সম্পর্কে আরও পরিষ্কার ধারণা পাওয়া সম্ভব হবে।
আশিস বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন বীরভূম জেলার একজন অত্যন্ত সুপরিচিত এবং প্রভাবশালী তৃণমূল নেতা। তাঁর রাজনৈতিক জীবনের ইতিহাস বেশ দীর্ঘ এবং বর্ণময়। ২০০১ সাল থেকে শুরু করে ২০২৬ সাল পর্যন্ত তিনি টানা পঁচিশ বছর রামপুরহাট বিধানসভা কেন্দ্র থেকে রাজ্য বিধানসভায় সফলভাবে প্রতিনিধিত্ব করে এসেছেন। তাঁর এই দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি শুধুমাত্র বিধানসভার একজন বিধায়কই ছিলেন না, বরং রাজ্য বিধানসভার ডেপুটি স্পিকার হিসেবেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দক্ষতার সঙ্গে পালন করেছেন। এর পাশাপাশি, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের মন্ত্রিসভায় তিনি স্কুল শিক্ষা এবং কৃষি দপ্তরের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের মন্ত্রী হিসেবেও সফলভাবে কাজ করেছেন। দলের দাপুটে নেতা এবং বীরভূম জেলা সভাপতি অনুব্রত মণ্ডলের শাসনকালে এই জেলায় তৃণমূল কংগ্রেসের যে কজন শীর্ষস্থানীয় মুখ ছিলেন, আশিস বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম প্রধান এক ব্যক্তিত্ব।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে তাঁর দীর্ঘ ও সফল রাজনৈতিক জীবনে কিছুটা ভাটা পড়েছিল বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন। সদ্য সমাপ্ত ২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে রামপুরহাট কেন্দ্র থেকেই তৃণমূল কংগ্রেসের টিকিটে ফের একবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন তিনি। কিন্তু দীর্ঘদিনের বিধায়ক হওয়া সত্ত্বেও এই গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টির প্রার্থী ধ্রুব সাহার কাছে চব্বিশ হাজারেরও বেশি ভোটের বিশাল ব্যবধানে পরাজিত হতে হয় এই প্রবীণ নেতাকে। দলের অভ্যন্তরীণ সূত্র থেকে জানা গিয়েছে যে, এই অভাবনীয় নির্বাচনী পরাজয়ের পর থেকে তাঁকে রাজনীতিতে আর আগের মতো সেভাবে সক্রিয় থাকতে দেখা যায়নি। তিনি রাজনৈতিক ময়দান থেকে নিজেকে কিছুটা গুটিয়ে নিয়েছিলেন এবং অনেকটা অন্তরালেই জীবনযাপন করছিলেন।
এমন এক টালমাটাল সময়ে এই মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটল, যখন পশ্চিমবঙ্গের সামগ্রিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি বড়সড় এবং ঐতিহাসিক পরিবর্তন এসেছে। টানা পনেরো বছর দাপটের সঙ্গে ক্ষমতায় থাকার পর এবারের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের পরাজয় ঘটেছে এবং রাজ্যে ক্ষমতার পালাবদল হয়েছে। সেই সঙ্গে দলের অনেক প্রাক্তন বিধায়ক এবং শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধে বর্তমানে দুর্নীতি সংক্রান্ত একাধিক অভিযোগের ভিত্তিতে কেন্দ্রীয় ও রাজ্য স্তরের বিভিন্ন তদন্ত চলছে। বেশ কয়েকজনকে ইতিমধ্যেই গ্রেপ্তারও করা হয়েছে। এই সামগ্রিক রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতির মাঝে আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো একজন বর্ষীয়ান নেতার এমন করুণ ও চরম পরিণতি স্বাভাবিকভাবেই নানা মহলে বহু প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। তিনি সত্যিই কোনো মানসিক অবসাদ থেকে আত্মহত্যা করেছেন কি না, এবং ঠিক কোন ঘটনা বা পরিস্থিতি তাঁকে এই চরম সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করল, পুলিশ এখন সেই সমস্ত দিকগুলো অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখছে। পুলিশের উচ্চপদস্থ আধিকারিকরা এই ঘটনার গভীরে পৌঁছানোর জন্য জোরদার তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছেন।
Discover more from বাংলাকাল
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
