নভি মুম্বই, ১৩ আগস্ট:
পরিবারের দাবি অনুযায়ী সমস্ত বৈধ পরিচয়পত্র থাকা সত্ত্বেও, অবৈধ অনুপ্রবেশকারী সন্দেহে নভি মুম্বই থেকে পশ্চিমবঙ্গের এক মুসলিম মহিলাকে আটক করে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠল পুলিশের বিরুদ্ধে। সাহিদা ফকির নামের ওই মহিলা নভি মুম্বইয়ে তাঁর পরিবারের সঙ্গে বসবাস করতেন। সম্প্রতি তিনি বাংলাদেশ থেকে তাঁর স্বামীকে ফোন করে নিজের দুরবস্থার কথা জানানোর পর বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে এবং মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে।
গত ১৯ জুলাই বাড়ি থেকে বেরিয়ে স্থানীয় বাজারে খাবার কিনতে গিয়ে নিখোঁজ হয়ে যান সাহিদা। তাঁর স্বামী জুম্মন ফকির জানিয়েছেন, এরপর মুম্বই পুলিশের চেম্বুর ক্রাইম ব্রাঞ্চ থেকে ফোন করে তাঁকে জানানো হয় যে, অবৈধ অনুপ্রবেশকারী সন্দেহে তাঁর স্ত্রীকে আটক করা হয়েছে। খবর পেয়ে জুম্মন দ্রুত পুলিশ স্টেশনে ছুটে যান। সাহিদা তাঁকে জানান যে, অবৈধ অভিবাসীদের রাখার জন্য নির্ধারিত একটি বিশেষ কেন্দ্রে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে এবং তাঁর মোবাইল ফোন ও আধার কার্ড কেড়ে নেওয়া হয়েছে।
স্ত্রীর নাগরিকত্ব প্রমাণের জন্য জুম্মন পুলিশের কাছে সাহিদার আধার কার্ড, ভোটার আইডি, জন্মের শংসাপত্র এবং স্কুলের শংসাপত্র জমা দেন। কিন্তু পরিবারের অভিযোগ, পুলিশ এই নথিপত্রগুলোকে যথেষ্ট বলে মানতে চায়নি। উলটে সাহিদার বাবা-মায়ের জন্মের শংসাপত্র দাবি করা হয়। জুম্মন প্রশ্ন তুলেছেন, সেই সময়ে যখন জন্মের শংসাপত্র সেভাবে দেওয়াই হতো না, তখন তিনি কোথা থেকে স্ত্রীর বাবা-মায়ের ওই নথি জোগাড় করবেন। পুলিশের এই দাবির মুখে তিনি অসহায় হয়ে পড়েন।
পরিবারের অভিযোগ অনুযায়ী, গত ২৩ জুলাই সাহিদাকে আসামে নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেখান থেকে সীমান্ত পার করে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হয়। ঘটনার কয়েকদিন পর বাংলাদেশ থেকে স্বামীর সঙ্গে যোগাযোগ করতে সক্ষম হন সাহিদা। জুম্মন জানিয়েছেন, সাহিদা বর্তমানে বাংলাদেশের সাতক্ষীরা জেলায় একটি পরিবারের আশ্রয়ে রয়েছেন। সাহিদা স্বামীকে ফোনে জানিয়েছেন, রাত একটার সময় তাঁকে সীমান্ত পার করে দেওয়া হয় এবং এরপর কয়েক ঘণ্টা ধরে কাদামাখা খেতের মধ্যে দিয়ে তাঁকে হাঁটতে হয়েছিল।
ফোনে সাহিদা আক্ষেপ করে বলেন যে তিনি একজন ভারতীয় নাগরিক এবং তিনি কেবল নিজের বাড়িতে ফিরতে চান। সপ্তম শ্রেণিতে পাঠরত ছেলের পড়াশোনা এবং দেখভাল নিয়ে তিনি চরম দুশ্চিন্তায় রয়েছেন বলেও জানিয়েছেন। এদিকে, বাংলাদেশে যে পরিবারটি সাহিদাকে আশ্রয় দিয়েছে, তারাও এখন প্রবল চাপের মুখে পড়েছে। জুম্মন দাবি করেছেন, বাংলাদেশের পুলিশ এবং বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ওই বাড়িটির ওপর নজরদারি চালাচ্ছে।
পরিবারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সাহিদার জন্ম ১৯৮৮ সালে পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগনা জেলার স্বরূপদহ গ্রামে। তাঁর নামে ১৯৯৫ সালে ইস্যু করা জন্মের শংসাপত্র, ২০০৮ সালের ভোটার আইডি, স্কুল সার্টিফিকেট এবং জমির রেকর্ড রয়েছে যা পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক প্রমাণ করে। ২০০২ সালের ভোটার তালিকাতেও তাঁর বাবা-মায়ের নাম ছিল বলে দাবি করা হয়েছে। যদিও বর্তমানে ভোটার তালিকা সংশোধনের কারণে সাহিদার নাম বিচারাধীন অবস্থায় রয়েছে। এই ঘটনার পর এলাকার বাসিন্দারা সাহিদাকে দ্রুত ফিরিয়ে আনার দাবিতে জেলা শাসকের কাছে চিঠি দিয়েছেন।
মানবাধিকার সংগঠন বাংলার মানবাধিকার সুরক্ষা মঞ্চ এই ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির কাছে চিঠি দিয়েছে। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক কিরীটী রায় অভিযোগ করেছেন, নিছক সন্দেহের বশবর্তী হয়ে বা প্রোফাইলিং করে কোনো ব্যক্তিকে বিদেশি নাগরিক হিসেবে ঘোষণা করার কোনো এক্তিয়ার প্রশাসনের নেই। সমস্ত বৈধ নথিপত্র থাকা সত্ত্বেও যেভাবে সাহিদাকে আটক করে বাংলাদেশে পুশব্যাক করা হয়েছে, তা আইনি প্রক্রিয়ার চরম লঙ্ঘন বলে তিনি দাবি করেছেন।
জুম্মন জানিয়েছেন, স্ত্রীকে ভারতে ফিরিয়ে আনতে তিনি কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হবেন এবং এর সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনি লড়াই চালিয়ে যাবেন। কীভাবে একজন দাবিদার ভারতীয় নাগরিককে নাগরিকত্ব প্রমাণের যথাযথ সুযোগ না দিয়ে দেশ থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হলো, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। এই বিষয়ে মুম্বই পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তাদের পক্ষ থেকে এখনো পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
Discover more from বাংলাকাল
Subscribe to get the latest posts sent to your email.

