ওয়াশিংটন, ২৪ জুলাই: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অত্যন্ত প্রভাবশালী ও বহুমূল্য অ-সামরিক বা বেসামরিক পারমাণবিক প্রযুক্তি চুক্তি (Civilian Nuclear Deal) চূড়ান্ত করতে হলে সৌদি আরবকে অবিলম্বে ইসরায়েলের সঙ্গে সমস্ত কূটনৈতিক তিক্ততা মুছে ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডস’-এ (Abraham Accords) যোগ দিতে হবে। ওয়াশিংটন ও রিয়াদের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার মাত্র একদিনের মাথায় সোশ্যাল মিডিয়ায় বিস্ফোরক আল্টিমেটাম দিয়ে গোটা মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে এক চরম তোলপাড় সৃষ্টি করলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
গত বুধবার মার্কিন শক্তি বিভাগ এবং সৌদি শক্তি মন্ত্রকের মধ্যে ঐতিহাসিক বেসামরিক পরমাণু সহযোগিতার ফ্রেমওয়ার্ক চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়। যার অধীনে মার্কিন প্রযুক্তি ব্যবহার করে সৌদি আরবে পারমাণবিক চুল্লি তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। কিন্তু চুক্তি সইয়ের চব্বিশ ঘণ্টা কাটতে না কাটতেই নিজের ট্রুথ সোশ্যাল (Truth Social) হ্যান্ডেলে হুঙ্কার ছাড়েন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।
ট্রাম্প স্পষ্ট জানিয়ে দেন, “আমেরিকার জ্বালানি দপ্তর ও সৌদি আরবের মধ্যে যে বেসামরিক পারমাণবিক চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হচ্ছে, তা সম্পূর্ণ নন-মিলিটারি বা অ-সামরিক প্রয়োজনের জন্য। এই চুক্তিটি তখনই চূড়ান্ত অনুমোদন পাবে, যখন সৌদি আরব অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ও সফল ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডস’-এর অংশ হবে এবং ইসরায়েলকে পূর্ণ কূটনৈতিক স্বীকৃতি দেবে।” হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি কারোলিন লিভিটও মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই অনমনীয় অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে জানিয়েছেন, সৌদি আরব আব্রাহাম আকর্ডসে যোগ না দিলে এই পারমাণবিক প্রস্তাব একেবারেই বাস্তবায়িত হবে না।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই আকস্মিক শর্ত প্রয়োগের ফলে সৌদির শক্তিশালী শাসক তথা যুবরাজ মহম্মদ বিন সালমান এক মারাত্মক কূটনৈতিক জটিলতার মুখোমুখি হয়েছেন। ২০২০ সালে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদেই মার্কিন মধ্যস্থতায় ইসরায়েলের সঙ্গে সংযুক্ত আরব আমিরাত (UAE), বাহরাইন, মরক্কো ও সুদান হাত মিলিয়ে আব্রাহাম আকর্ডসে স্বাক্ষর করেছিল। মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রভাবশালী দেশ সৌদি আরবকে এই চুক্তিতে টানতে দীর্ঘদিন ধরে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে ওয়াশিংটন।
তবে রিয়াদের অবস্থান অত্যন্ত পরিষ্কার। আন্তর্জাতিক মঞ্চে সৌদি আরব বারবার জানিয়েছে, ফিলিস্তিনকে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়ার সুনির্দিষ্ট রূপরেখা ছাড়া তারা কোনোভাবেই ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সমঝোতায় যাবে না। বিশেষ করে গাজা যুদ্ধের আবহে সাধারণ আরববাসীর চরম ইসরায়েল-বিরোধী জনমতের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ফিলিস্তিনকে বাদ দিয়ে ইসরায়েলের হাত ধরা রিয়াদের জন্য অত্যন্ত স্পর্শকাতর রাজনৈতিক ঝুঁকি। একদিকে পরমাণু প্রযুক্তির মাধ্যমে নিজেদের আধুনিক শক্তির চাহিদা পূরণ, আর অন্যদিকে ফিলিস্তিনের ঐতিহাসিক নীতি—এই দুইয়ের টানাপোড়েনে চরম উভয়সংকটে পড়েছে সৌদি রাজপরিবার।
মার্কিন শক্তি দপ্তর দাবি করেছে যে এই চুক্তি আন্তর্জাতিক পরমাণু নিরাপত্তা বিধি মেনেই করা হয়েছে। এমনকি ট্রাম্পও বার্তা দিয়েছেন যে এই বেসামরিক প্রকল্পে সৌদিকে কোনো ধরনের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের (Uranium Enrichment) অনুমোদন দেওয়া হবে না। তা সত্ত্বেও ওয়াশিংটনের ক্যাপিটল হিল এবং ইজরায়েলের অভ্যন্তরে তীব্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
মার্কিন কংগ্রেসের একাধিক ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান আইনপ্রণেতা আশঙ্কা প্রকাশ করে জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যের মতো চরম অস্থিতিশীল এলাকায় এ জাতীয় সংবেদনশীল প্রযুক্তি হস্তান্তরিত হলে তা ভবিষ্যতে বিপজ্জনক পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতার পথ উন্মুক্ত করে দিতে পারে। বিশেষ করে এই চুক্তিতে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (IAEA) অতিরিক্ত কঠোর নজরদারি বা ‘অতিরিক্ত প্রোটোকল’ যুক্ত না থাকায় উদ্বেগ আরও ঘনীভূত হয়েছে।
আমেরিকান ক্যাপিটল হিলের অনুমোদনের আগেই ট্রাম্পের এই শর্ত চাপানোর রাজনীতি এখন জল কোনদিকে গড়ায়, সেদিকেই নজর রাখছে সমগ্র আন্তর্জাতিক মহল। রিয়াদ কি যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক শক্তির বিনিময়ে ঐতিহাসিক ফিলিস্তিন নীতি বিসর্জন দিয়ে ইসরায়েলকে জড়িয়ে ধরবে, নাকি ট্রাম্পের শর্ত খারিজ করে আমেরিকার সঙ্গে শত শত কোটি ডলারের পরমাণু চুক্তি বাতিল হতে দেবে—তা নিয়ে এখন জোর জল্পনা আন্তর্জাতিক কূটনীতির অলিন্দে।
বাংলাকাল-কে ফলো করুন
Discover more from বাংলাকাল
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
