প্রয়াগরাজ, ১১ অগাস্ট:
প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকদের নিজেদের পছন্দমতো ধর্ম পালন করা এবং স্বাধীনভাবে জীবনযাপন করার পূর্ণ সাংবিধানিক অধিকার রয়েছে। এই অধিকার থেকে তাঁদের কোনোভাবেই বঞ্চিত করা যায় না। উত্তরপ্রদেশের আগ্রার দুই প্রাপ্তবয়স্ক বোনের দায়ের করা একটি হেবিয়াস কর্পাস বা বন্দী প্রত্যর্পণ মামলার শুনানিতে এই গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ জানাল এলাহাবাদ হাইকোর্ট। একইসঙ্গে ওই দুই বোনকে তাঁদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে আটকে রাখা এবং তাঁদের ব্যক্তিগত স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করার কারণে তাঁদের বাবাকে এবং উত্তরপ্রদেশ রাজ্য সরকারকে যৌথভাবে পঁচিশ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। আগামী আট সপ্তাহের মধ্যে এই বিপুল অঙ্কের আর্থিক ক্ষতিপূরণ ওই দুই বোনকে হস্তান্তর করতে হবে বলে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।
আদালত সূত্রে জানা গিয়েছে, উত্তরপ্রদেশের আগ্রা নিবাসী দুই বোন, পঁয়ত্রিশ বছর বয়সী অংশু ভাটিয়া এবং কুড়ি বছর বয়সী দিয়া ভাটিয়া নিজেদের ইচ্ছায় ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, ২০২০ সালে বড় বোন অংশু ভাটিয়া ধর্মান্তরিত হয়ে নিজের নাম রাখেন আমিনা। অন্যদিকে, তার ঠিক পরের বছর অর্থাৎ ২০২১ সালে ছোট বোন দিয়া ভাটিয়াও ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন এবং নিজের নাম পরিবর্তন করে রাখেন জয়া। দুই প্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের এই ধর্মান্তরের সিদ্ধান্ত একেবারেই মেনে নিতে পারেননি তাঁদের বাবা অনিল কুমার ভাটিয়া। তিনি মেয়েদের এই সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করেন। শুধু তাই নয়, মেয়েদের বিরুদ্ধে উত্তরপ্রদেশ বেআইনি ধর্মান্তরকরণ বিরোধী আইন বা ইউপি আনলফুল কনভার্সন অ্যাক্টের অধীনে একটি আইনি মামলাও দায়ের করেন তিনি। এরপরই ওই দুই প্রাপ্তবয়স্ক বোনকে তাঁদের বাবা জোরপূর্বক আটকে রাখেন বলে গুরুতর অভিযোগ ওঠে।
নিজেদের বাবার কাছেই এইভাবে অবরুদ্ধ থাকার পর ওই দুই বোন নিজেদের মুক্তি এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ফিরে পেতে শেষ পর্যন্ত এলাহাবাদ হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন। নিজেদের মৌলিক অধিকার ফিরে পেতে তাঁরা আদালতে একটি হেবিয়াস কর্পাস পিটিশন দায়ের করেন। গত ৬ অগাস্ট, ২০২৬ তারিখে এলাহাবাদ হাইকোর্টের বিচারপতি সন্দীপ জৈন এই মামলার বিস্তারিত শুনানি শেষে চূড়ান্ত রায়দান করেন। রায়ে তিনি অত্যন্ত কঠোর ভাষায় জানিয়ে দেন যে, ভারতীয় সংবিধান অনুযায়ী প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকের নিজের পছন্দের ধর্ম বেছে নেওয়ার এবং নিজের পছন্দমতো স্থানে বা ব্যক্তির সঙ্গে স্বাধীনভাবে বসবাস করার সম্পূর্ণ আইনি অধিকার রয়েছে। এই অধিকার খর্ব করার ক্ষমতা প্রশাসনের বা পরিবারের অন্য কোনো সদস্যের নেই। তাই ওই দুই বোন এখন থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীন এবং তাঁরা যেখানে খুশি, যার সঙ্গে খুশি বসবাস করতে পারবেন। তাঁদের এই সাংবিধানিক অধিকারে কেউ কোনো ধরনের বাধা সৃষ্টি করতে পারবে না।
বিচারপতি সন্দীপ জৈন তাঁর নির্দেশে আরও জানিয়েছেন যে, ওই দুই বোনের সমস্ত ব্যক্তিগত নথিপত্র এবং অন্যান্য জিনিসপত্র যা বর্তমানে তাঁদের বাবার কাছে আটকে রয়েছে, তা আগামী সাত দিনের মধ্যে তাঁদের হাতে তুলে দিতে হবে। কোনোভাবেই তাঁদের কোনো নথিপত্র আটকে রাখা যাবে না। মেয়েদের ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং ব্যক্তিগত জীবনের কোনো সিদ্ধান্তে তাঁদের বাবা বা অন্য কেউ আর কোনোভাবে হস্তক্ষেপ করতে পারবেন না বলেও আদালত কড়া নির্দেশ দিয়েছে। প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিক হিসেবে তাঁদের নিজস্ব পছন্দকে সম্মান জানাতে হবে।
আইনজীবীদের মতে, ব্যক্তিগত স্বাধীনতা এবং ধর্মীয় অধিকার রক্ষায় এলাহাবাদ হাইকোর্টের এই রায় অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি পদক্ষেপ। দেশের সংবিধান নাগরিকদের যে জীবনের অধিকার এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতার কথা বলেছে, এই রায়ের মাধ্যমে তাকেই আরও একবার সুনিশ্চিত করল উচ্চ আদালত। একইসঙ্গে, প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাঁদের আটকে রাখার প্রবণতার বিরুদ্ধেও এই রায় একটি কড়া আইনি বার্তা দিল। রাজ্য সরকার এবং বাবাকে যৌথভাবে পঁচিশ লক্ষ টাকার যে বিপুল আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ আদালত দিয়েছে, তা নাগরিক অধিকার লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে একটি নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত স্থাপন করল।
Discover more from বাংলাকাল
Subscribe to get the latest posts sent to your email.

