উত্তরপ্রদেশে কানোয়ার যাত্রার পথে মুসলিম যুবকের বিরিয়ানির দোকান বুলডোজারে গুঁড়িয়ে দিল প্রশাসন

উত্তরপ্রদেশে কানোয়ার যাত্রার পথে মুসলিম যুবকের বিরিয়ানির দোকান বুলডোজারে গুঁড়িয়ে দিল প্রশাসন

বেরেলি, ১১ অগাস্ট:

উত্তরপ্রদেশের বেরেলি জেলার বোহেরি এলাকায় কানোয়ার যাত্রার পথে একটি মুসলিম যুবকের চিকেন বিরিয়ানির দোকান বুলডোজার দিয়ে সম্পূর্ণ গুঁড়িয়ে দিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। বজরং দলের কর্মীদের তীব্র আপত্তির এবং অভিযোগের ভিত্তিতে এই চরম পদক্ষেপ নেওয়া হয়। এলাকায় শান্তি ভঙ্গের আশঙ্কার কথা বলে পুলিশ ওই দোকানের মালিক মহম্মদ সলমান সহ কয়েকজনকে অবিলম্বে আটক করে। উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের অভিযোগের পরপরই কোনো রকম আইনি প্রক্রিয়া বা পূর্ব নোটিশ ছাড়াই সরাসরি বুলডোজার দিয়ে মুসলিম যুবকের দোকান ভেঙে ফেলার এই ঘটনা নতুন করে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ব্যবসার ওপর প্রশাসনিক নিপীড়নের বিতর্ক উসকে দিয়েছে। মাকতুব মিডিয়ার প্রতিবেদনে এই ঘটনাকে সংখ্যালঘুদের ওপর রাষ্ট্রীয় আগ্রাসনের আরও একটি নিদর্শন হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন ও সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা গিয়েছে, শুক্রবার সন্ধ্যায় বোহেরি এলাকার পুরনো বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন ওই বিরিয়ানির দোকানে হিন্দুত্ববাদী সংগঠন বজরং দলের কর্মীরা নজরদারি চালায়। বজরং দলের স্থানীয় এক নেতা সানু গাংওয়ার জানান, ওই দোকানে আমিষ খাবার বিক্রি হচ্ছে বলে তাদের কাছে আগে থেকেই খবর ছিল। সেই খবরের সত্যতা যাচাই করতে তাদের কর্মীরা ক্রেতা সেজে ওই দোকানে যায় এবং চিকেন বিরিয়ানি কিনে নিশ্চিত হয়। এরপরই তারা স্থানীয় থানায় গিয়ে জোরদার অভিযোগ দায়ের করে যে, পবিত্র শ্রাবণ মাসে কানোয়ার যাত্রার প্রধান পথের পাশে এই ধরনের আমিষ খাবার বিক্রি হিন্দু পুণ্যার্থীদের ধর্মীয় অনুভূতিতে চরম আঘাত হানছে। অভিযোগ পাওয়ার পর পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায় এবং জনসমক্ষে শান্তিভঙ্গের অজুহাত দেখিয়ে দোকানের মালিক মহম্মদ সলমান এবং তার এক সহযোগী রইসকে আটক করে থানায় নিয়ে যায়।

এই ঘটনার কিছুক্ষণের মধ্যেই স্থানীয় পুরসভার একটি জেসিবি বা বুলডোজার নিয়ে প্রশাসনিক আধিকারিকরা পুলিশ বাহিনী নিয়ে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। উপস্থিত জনতার সামনেই ওই বিরিয়ানির টিনের চাল এবং কাউন্টার সহ পুরো দোকানটি সম্পূর্ণ মাটিতে মিশিয়ে দেওয়া হয়। পুরসভার কার্যনির্বাহী আধিকারিক শশী প্রভা চৌধুরী অবশ্য দাবি করেছেন, দোকানটি একটি নর্দমার ওপর বেআইনিভাবে নির্মাণ করা হয়েছিল। তাঁর মতে, এটি পুরসভার নিয়মিত বেআইনি দখলদারি উচ্ছেদ অভিযানের একটি অংশ মাত্র এবং এর সঙ্গে বজরং দলের অভিযোগের সরাসরি কোনো আইনি সম্পর্ক নেই। তবে প্রশাসনের এই সরকারি যুক্তির সঙ্গে বজরং দলের অভিযোগের আকস্মিক সময়ের নিখুঁত মিল থাকায়, এই তথাকথিত উচ্ছেদ অভিযানকে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর একটি পরিকল্পিত এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত আক্রমণ হিসেবেই দেখছেন মানবাধিকার কর্মী ও স্থানীয়রা।

দোকান মালিকের বাবা লোধিপুরের বাসিন্দা নাসিম আহমেদ ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করে জানিয়েছেন, তাঁর ছেলে দীর্ঘদিন ধরেই সেখানে নিয়মিত বিরিয়ানির ব্যবসা করে আসছিল এবং এটিই তাদের পরিবারের আয়ের একমাত্র উৎস ছিল। বজরং দলের কর্মীরা এসে যখন প্রথমবার আমিষ বিক্রির বিরোধিতা করে, তখন তাঁর পরিবার তাদের কাছে হাত জোড় করে ক্ষমা চেয়ে নিয়েছিল এবং পরিস্থিতি শান্ত করার আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও পুলিশ প্রশাসন তাদের কোনো কথাই শোনেনি। উলটে শাস্তিমূলক পদক্ষেপ হিসেবে বুলডোজার দিয়ে তাদের উপার্জনের একমাত্র সম্বলটুকু নিমিষে ধ্বংস করে দেওয়া হলো।

কানোয়ার যাত্রা হলো হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের একটি অন্যতম বৃহৎ বার্ষিক তীর্থযাত্রা। এই সময়ে লক্ষ লক্ষ পুণ্যার্থী পবিত্র গঙ্গা নদীর জল বহন করে বিভিন্ন শিব মন্দিরে নিয়ে যান। পুণ্যার্থীদের এই যাত্রাকে নির্বিঘ্ন করতে উত্তরপ্রদেশ সরকার প্রতি বছরই নিরাপত্তার কড়াকড়ি বৃদ্ধি করে। রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে সম্প্রতি নির্দেশিকা জারি করা হয়েছিল যে, শ্রাবণ মাসে কানোয়ার যাত্রার নির্দিষ্ট রুটগুলোতে কোনো ধরনের আমিষ খাবার, মাংস বা মাছ বিক্রি করা যাবে না। পুণ্যার্থীদের ধর্মীয় ভাবাবেগের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতেই এই সরকারি নির্দেশ বলে প্রশাসনের দাবি। কিন্তু এই নির্দেশিকার আড়ালে মূলত মুসলিম ব্যবসায়ীদের আর্থিকভাবে পঙ্গু করার চেষ্টা চলছে বলে দীর্ঘদিনের অভিযোগ রয়েছে।

মাকতুব মিডিয়ার মতো স্বাধীন সংবাদমাধ্যমগুলো বারবার তুলে ধরেছে যে, দেশজুড়ে আমিষ খাবার বিক্রির ওপর কোনো আইনি নিষেধাজ্ঞা না থাকা সত্ত্বেও, শুধুমাত্র ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠের ভাবাবেগের দোহাই দিয়ে একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের ব্যবসাকে টার্গেট করা হচ্ছে। ভারতের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্ট বারবার এই ধরনের শাস্তিমূলক বা বেআইনি বুলডোজার উচ্ছেদকে অসাংবিধানিক বলে আখ্যা দিয়েছে। শীর্ষ আদালতের স্পষ্ট নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও উত্তরপ্রদেশ প্রশাসন সেই নির্দেশিকাকে কার্যত বুড়ো আঙুল দেখিয়ে উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলোর চাপের কাছে নতিস্বীকার করে সংখ্যালঘুদের জীবন ও জীবিকার অধিকার হরণ করেই চলেছে। কোনো অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার আগেই বুলডোজার দিয়ে সম্পত্তি ধ্বংস করে দেওয়ার এই প্রবণতা আইনের শাসনের পরিপন্থী এবং এটি দেশের গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ কাঠামোকে ক্রমশ দুর্বল করে দিচ্ছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

বাংলাকাল-কে ফলো করুন

Facebook Comments Box

Discover more from বাংলাকাল

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Leave a Comment

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply