নতুন দিল্লি, ১১ অগাস্ট:
জাতীয় সঙ্গীত ‘জন গণ মন’-এর পাশাপাশি এবার জাতীয় স্তোত্র ‘বন্দে মাতরম’-কেও সম্পূর্ণ আইনি সুরক্ষার আওতায় আনতে এবং সমান মর্যাদা প্রদান করতে সম্প্রতি ‘প্রিভেনশন অফ ইনসাল্টস টু ন্যাশনাল অনার (অ্যামেন্ডমেন্ট) অ্যাক্ট, ২০২৬’ বা জাতীয় সম্মান অবমাননা প্রতিরোধ সংশোধনী আইনটি রাষ্ট্রপতির অনুমোদন পেয়েছে। এই নতুন সংশোধনী বিলে দেশের সমস্ত সরকারি এবং আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠানগুলোর একেবারে শুরুতে এবং শেষে ‘বন্দে মাতরম’-এর সম্পূর্ণ ছয়টি স্তবক গাওয়া সম্পূর্ণরূপে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কিন্তু কেন্দ্রের এই নতুন নির্দেশিকা এবং আইনি পদক্ষেপ নিয়ে এবার প্রকাশ্যেই তীব্র সমালোচনায় সরব হলেন প্রবীণ কংগ্রেস নেতা এবং তিরুবনন্তপুরমের সাংসদ শশী থারুর। তিনি এই নিয়ম পালনের ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় ধরে দাঁড়িয়ে থাকার ব্যবহারিক সমস্যাগুলো অত্যন্ত যুক্তিসঙ্গতভাবে তুলে ধরেছেন এবং জোর করে চাপিয়ে দেওয়া দেশপ্রেমের যৌক্তিকতা নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর মতে, আইনের মাধ্যমে জোর করে সাধারণ নাগরিকদের কাছ থেকে সম্মান আদায় করতে গেলে শেষ পর্যন্ত তা হিতে বিপরীত হতে পারে।
শশী থারুর তাঁর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বিবৃতিতে গানগুলোর সময়কাল নিয়ে একটি বাস্তবসম্মত এবং পুঙ্খানুপুঙ্খ পরিসংখ্যান তুলে ধরেছেন। তিনি দেশবাসীকে মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, আমাদের জাতীয় সঙ্গীত ‘জন গণ মন’ গাইতে সাধারণত ৫২ সেকেন্ড সময় লাগে এবং সেই স্বল্প সময়টুকু যেকোনো মানুষের পক্ষে সসম্মানে এবং স্থিরভাবে দাঁড়িয়ে থাকা অত্যন্ত স্বাভাবিক ও স্বতঃস্ফূর্ত একটি বিষয়। কিন্তু ‘বন্দে মাতরম’-এর ক্ষেত্রে বিষয়টি একেবারেই আলাদা। এই গানের সম্পূর্ণ ছয়টি স্তবক শেষ করে গাইতে সময় লাগে প্রায় তিন মিনিট দশ সেকেন্ড। অর্থাৎ, সরকারের নতুন নিয়ম অনুযায়ী যেকোনো সরকারি অনুষ্ঠানের প্রারম্ভে এবং সমাপ্তিতে উপস্থিত দর্শক, অতিথি এবং সরকারি আধিকারিকদের তিন মিনিটেরও বেশি সময় ধরে বাধ্যতামূলকভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। কংগ্রেস সাংসদ মনে করেন, এই দীর্ঘ সময় ধরে নিয়ম মেনে একটানা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা বৃদ্ধ বা অসুস্থ ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে যেমন শারীরিক দিক থেকে কষ্টকর, তেমনই সাধারণ মানুষের কাছেও এটি চরম ধৈর্যের পরীক্ষা হতে পারে। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, জাতীয় সঙ্গীত এবং জাতীয় স্তোত্র উভয়ের প্রতিই তাঁর অগাধ শ্রদ্ধা রয়েছে, তবে ব্যবহারিক দিকটি আইন প্রণয়নের আগে সরকারের অবশ্যই বিস্তারিত আলোচনা ও বিবেচনা করা উচিত ছিল।
কংগ্রেস সাংসদ এই দীর্ঘায়িত নিয়মের প্রকৃত প্রভাব বোঝাতে দক্ষিণের রাজ্য তামিলনাড়ুর একটি সাম্প্রতিক পরিস্থিতির উদাহরণও সবার সামনে তুলে ধরেন। উল্লেখ্য, সম্প্রতি তামিলনাড়ু সরকার নির্দেশ দিয়েছে যে সেখানে যেকোনো সরকারি বা আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠানের শুরুতে তাদের রাজ্য সঙ্গীত ‘তামিল থাই ভাজথু’ গাওয়া বাধ্যতামূলক। এই রাজ্য সঙ্গীতটি পরিবেশন করতেও আরও প্রায় দুই মিনিট সময় লাগে। শশী থারুর হিসাব করে দেখিয়েছেন, এর ফলে একটি অনুষ্ঠানে জাতীয় স্তোত্র, জাতীয় সঙ্গীত এবং রাজ্য সঙ্গীত মিলিয়ে শুরুর মুহূর্তে এবং শেষের মুহূর্তে উপস্থিত দর্শকদের অন্তত ছয় মিনিটেরও বেশি সময় ধরে একটানা দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। সব মিলিয়ে বিচার করলে দেখা যায়, একটি সাধারণ অনুষ্ঠানে শুধুমাত্র নিয়ম রক্ষার জন্যই নাগরিকদের প্রায় বারো মিনিট বাড়তি সময় শুধু দাঁড়িয়ে কাটাতে হবে। থারুরের মতে এটি একেবারেই অবাস্তব এবং মানুষের শারীরিক ও মানসিক ধৈর্যের পরিপন্থী একটি সিদ্ধান্ত।
আইন করে দেশপ্রেম বা সম্মান চাপিয়ে দেওয়ার সরকারি প্রচেষ্টার তীব্র সমালোচনা করে থারুর তাঁর যুক্তিতে আরও ধার বাড়িয়েছেন। তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, দেশপ্রেম সম্পূর্ণভাবে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত আবেগ এবং অন্তরের গভীর অনুভূতি। কোনো আইনি কাঠামোর ভয় দেখিয়ে বা বাধ্যতামূলক নিয়ম করে কখনোই দেশের সাধারণ মানুষের মনে প্রকৃত শ্রদ্ধা বা জাতীয়তাবাদ তৈরি করা যায় না। বরং এই ধরনের দীর্ঘায়িত এবং ক্লান্তিকর নিয়ম জোর করে চাপিয়ে দিলে মানুষের মনে সম্মানের বদলে বিরক্তি এবং ক্ষোভ জন্ম নেওয়ার প্রবল সম্ভাবনা থাকে। মানুষের স্বাভাবিক ধৈর্যের সীমা এবং স্বেচ্ছায় অংশগ্রহণের মানসিকতাকে কোনোভাবেই আইনি ঘেরাটোপে বাঁধা উচিত নয় বলে তিনি মনে করেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, এই সংশোধনী আইন পাশ করিয়ে নেওয়ার ফলে আগামী দিনে এই ধরনের আরও ব্যবহারিক সমস্যা সামনে আসতে পারে। যদিও কেন্দ্র সরকারের পক্ষ থেকে এই আইনটিকে ‘বন্দে মাতরম’-এর ঐতিহ্যের প্রতি একটি বিশেষ সম্মান হিসেবেই তুলে ধরা হচ্ছে। কিন্তু শশী থারুরের মতো প্রথম সারির এক বিরোধী নেতার এই সুস্পষ্ট পর্যবেক্ষণ আগামী দিনে অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোকেও এই বিষয়ে সরব হতে উদ্বুদ্ধ করতে পারে। বাধ্যতামূলক দেশপ্রেম নাকি মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত আবেগ, কোনটিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত, তা নিয়ে এখন সামাজিক মাধ্যম থেকে শুরু করে জাতীয় রাজনীতির অলিন্দে জোরদার চর্চা শুরু হয়েছে।
Discover more from বাংলাকাল
Subscribe to get the latest posts sent to your email.

