নয়াদিল্লি, ৩ আগস্ট:ছয়জন মহিলা কুস্তিগীরের দায়ের করা বহুল আলোচিত যৌন হেনস্থার মামলায় ভারতীয় কুস্তি মহাসংঘ বা রেসলিং ফেডারেশন অব ইন্ডিয়ার (ডব্লিউএফআই) প্রাক্তন সভাপতি ব্রিজ ভূষণ শরণ সিংকে সম্পূর্ণ বেকসুর খালাস দিয়েছে দিল্লির রাউস অ্যাভিনিউ আদালত। দুই বছর ধরে চলা দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর সোমবার অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট (সিজেএম) অশ্বিনী পানওয়ার এই বহুল প্রতীক্ষিত সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন। এই মামলায় ব্রিজ ভূষণের পাশাপাশি সহ-অভিযুক্ত তথা কুস্তি মহাসংঘের প্রাক্তন সহকারী সম্পাদক বিনোদ তোমরকেও সমস্ত অভিযোগ থেকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। ইতিপূর্বে গত ২ জুলাই আদালত এই মামলার রায় স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল এবং নির্দেশ অনুসারে উভয় পক্ষই তাদের লিখিত যুক্তি আদালতে পেশ করেছিল।
আদালতের নথি ও প্রক্রিয়া অনুযায়ী, ভারতীয় দণ্ডবিধির (আইপিসি) ৩৫৪ নম্বর ধারা অর্থাৎ নারীর শ্লীলতাহানির উদ্দেশ্যে হামলা বা অপরাধমূলক বলপ্রয়োগ, ৩৫৪এ নম্বর ধারা অর্থাৎ যৌন হেনস্থা এবং ৫০৬ (১) নম্বর ধারা অর্থাৎ অপরাধমূলক হুমকির অধীনে ব্রিজ ভূষণ শরণ সিংয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়েছিল। অন্যদিকে সহ-অভিযুক্ত বিনোদ তোমরের বিরুদ্ধে অপরাধমূলক হুমকির অভিযোগ আনা হয়েছিল। এই সমস্ত ধারায় অপরাধ প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ডের আইনি বিধান রয়েছে। তবে সমস্ত তথ্যপ্রমাণ ও সাক্ষ্য বিশ্লেষণ করার পর আদালত দুজনকেই সব ধরণের অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দিয়েছে।
এই ঐতিহাসিক ও আলোচিত আইনি লড়াইয়ের সূত্রপাত ঘটেছিল ২০২৩ সালের জানুয়ারি মাসে। দিল্লির যন্তর মন্তরে দেশের একাধিক শীর্ষস্থানীয় মহিলা কুস্তিগীর একটি অভূতপূর্ব ও দীর্ঘমেয়াদী আন্দোলন শুরু করেছিলেন। তৎকালীন ডব্লিউএফআই প্রধান ব্রিজ ভূষণ শরণ সিংয়ের বিরুদ্ধে বহু বছর ধরে একাধিক মহিলা অ্যাথলিটকে যৌন হেনস্থা করার অভিযোগ তুলে তাঁরা সোচ্চার হন। আন্দোলনকারীরা ব্রিজ ভূষণের অবিলম্বে গ্রেপ্তার এবং কুস্তি মহাসংঘের সভাপতির পদ থেকে তাঁর অপসারণের দাবি জানান। সেই সময় কেন্দ্রীয় ক্রীড়া মন্ত্রক ঘটনার তদন্তে একটি কমিটি গঠনের আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা সাময়িকভাবে তাঁদের প্রতিবাদ স্থগিত রাখেন। কিন্তু পরবর্তীতে কোনো দৃশ্যমান বা কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি দাবি করে ২০২৩ সালের এপ্রিল মাসে কুস্তিগীররা পুনরায় যন্তর মন্তরে অবস্থান বিক্ষোভ শুরু করেন।
উত্তাল পরিস্থিতির মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের সরাসরি হস্তক্ষেপে ২০২৩ সালের ২৮ এপ্রিল দিল্লি পুলিশ দুটি পৃথক প্রথম তথ্য বিবরণী বা এফআইআর নথিভুক্ত করতে বাধ্য হয়। এর মধ্যে প্রথম এফআইআরটি ছিল ছয়জন প্রাপ্তবয়স্ক মহিলা কুস্তিগীরের সম্মিলিত অভিযোগের ভিত্তিতে এবং দ্বিতীয়টি ছিল একজন অপ্রাপ্তবয়স্ক কুস্তিগীরের অভিযোগের ভিত্তিতে পকসো বা প্রটেকশন অব চিলড্রেন ফ্রম সেক্সুয়াল অফেন্সেস আইনে দায়ের করা মামলা। পুলিশি নথি অনুযায়ী, ২০১২ সাল থেকে ২০২২ সালের মধ্যবর্তী সময়ে এই যৌন হেনস্থার ঘটনাগুলো ঘটেছিল বলে অভিযোগকারীদের তরফে দাবি করা হয়েছিল।
পরবর্তীকালে পকসো আইনের অধীন দায়ের হওয়া মামলাটির আইনি নিষ্পত্তি ঘটে। ২০২৩ সালের জুন মাসে দিল্লি পুলিশ তদন্ত শেষে আদালতে একটি ক্লোজার রিপোর্ট দাখিল করে জানায় যে ওই অভিযোগে কোনো সমর্থনযোগ্য তথ্যপ্রমাণ পাওয়া যায়নি। এর পর ওই অপ্রাপ্তবয়স্ক ভুক্তভোগীও নিজের বক্তব্য পরিবর্তন করে অভিযোগ প্রত্যাহার করে নেন। ফলে ২০২৩ সালের মে মাসে দিল্লির আদালত ব্রিজ ভূষণের বিরুদ্ধে থাকা পকসো মামলাটি আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ করে দেওয়ার নির্দেশ দেয়।
ছয়জন প্রাপ্তবয়স্ক মহিলা কুস্তিগীরের মামলার ক্ষেত্রে ২০২৩ সালের জুন মাসে দিল্লি পুলিশ তদন্ত শেষ করে একটি বিস্তৃত চার্জশিট জমা দেয়, যেখানে অভিযুক্তদের বিচারের মুখোমুখি করার মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছিল। এর এক বছর পর ২০২৪ সালের মে মাসে আদালত উভয় অভিযুক্তের বিরুদ্ধে চার্জ গঠন করে। তবে ব্রিজ ভূষণ ও বিনোদ তোমর নিজেদের নির্দোষ বলে দাবি করেন এবং বিচারে অংশগ্রহণের ইচ্ছা প্রকাশ করেন। ২০২৪ সালের জুলাই মাস থেকে বন্ধ দরজার পেছনে অর্থাৎ রুদ্ধদ্বার কক্ষে বিচারপ্রক্রিয়া শুরু হয়। এই প্রক্রিয়া চলাকালীন মোট ৩২ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়, যাদের মধ্যে অভিযোগকারী ছয়জন মহিলা কুস্তিগীর ছাড়াও ডব্লিউএফআই এবং স্পোর্টস অথরিটি অব ইন্ডিয়া বা সাই-এর একাধিক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন।
বিচারের পুরো সময়জুড়ে রাজ্য পক্ষের হয়ে অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর মণীশ রাওয়াত সওয়াল করেন এবং ভুক্তভোগীদের পক্ষে বিশিষ্ট আইনজীবী রেবেকা জন প্রতিনিধিত্ব করেন। প্রসিকিউশনের যুক্তি ছিল যে সমস্ত সাক্ষী ভুক্তভোগীদের অভিযোগের সত্যতা সমর্থন করেছেন। অপরপক্ষে ব্রিজ ভূষণের প্রধান আইনজীবী রাজীব মোহন সমস্ত অভিযোগ ভিত্তিহীন ও মনগড়া বলে দাবি করেন। তিনি আদালতে সওয়াল করেন যে ব্রিজ ভূষণকে কুস্তি মহাসংঘের পদ থেকে সরানোর চক্রান্ত হিসেবেই এই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা দায়ের করা হয়েছিল এবং বিচার চলাকালে ভুক্তভোগীদের বক্তব্যে নানা অমিল দেখা গেছে। উভয় পক্ষের দীর্ঘ সওয়াল জবাব শোনার পর আদালত এই রায় প্রদান করে প্রাক্তন ডব্লিউএফআই প্রধান ও সহকারী সম্পাদককে বেকসুর খালাস দিল।
Discover more from বাংলাকাল
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
