ছত্তিশগড়ে ‘ঘর ওয়াপসি’-র চাপে ঘরছাড়া ১০ আদিবাসী খ্রিষ্টান পরিবার, গ্রামে ফেরায় নিষেধাজ্ঞা জারি

ছত্তিশগড়ে ‘ঘর ওয়াপসি’-র চাপে ঘরছাড়া ১০ আদিবাসী খ্রিষ্টান পরিবার, গ্রামে ফেরায় নিষেধাজ্ঞা জারি

সুকমা, ৮ অগাস্ট: ছত্তিশগড়ের সুকমা জেলার চিতলনার গ্রামে হিন্দু ধর্মে প্রত্যাবর্তনের বা ‘ঘর ওয়াপসি’-র দাবিতে ব্যাপক চাপের মুখে পড়েছেন আদিবাসী খ্রিষ্টানরা। মাকতুব মিডিয়ার সাম্প্রতিক একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, ধর্মান্তরিত হওয়ার কারণে ওই গ্রামের প্রায় ১০টি আদিবাসী খ্রিষ্টান পরিবার চরম হেনস্থা, বঞ্চনা ও হিংসার শিকার হয়েছেন। গত মার্চ মাসে হিন্দু ধর্মে ফিরে আসার জন্য তাদের উপর একটি উন্মত্ত জনতা আকস্মিক হামলা চালায়। এই হিংসাত্মক হামলায় একাধিক ব্যক্তি গুরুতর আহত হন এবং জীবনের নিরাপত্তার অভাবে ওই পরিবারগুলি নিজেদের জন্মভিটে ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। দীর্ঘ কয়েক মাস ধরে গৃহহীন অবস্থায় দিন কাটানোর পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার বদলে আরও জটিল রূপ ধারণ করেছে।

বাস্তুচ্যুত হওয়ার কয়েক মাস পর জুলাই মাসে স্থানীয় গ্রাম পঞ্চায়েতের পক্ষ থেকে একটি আনুষ্ঠানিক নোটিশ জারি করা হয়। ওই নোটিশে স্পষ্টভাবে ওই খ্রিষ্টান পরিবারগুলির গ্রামে ফেরার উপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। এই নির্দেশিকার ফলে নিজেদের বাড়িতে ফেরার শেষ আশাটুকুও হারাতে বসেছেন ওই দশটি পরিবারের অসহায় সদস্যরা। স্থানীয় প্রশাসন ও পঞ্চায়েতের এই বৈষম্যমূলক ভূমিকার ফলে গৃহহীন আদিবাসী পরিবারগুলির ভবিষ্যৎ বর্তমানে গভীর অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। একটি গণতান্ত্রিক দেশে গ্রাম পঞ্চায়েতের মতো প্রশাসনিক স্তরের এমন একটি নির্দেশিকা ঘিরে মানবাধিকার লঙ্ঘনের তীব্র অভিযোগ উঠেছে।

এই সম্পূর্ণ ঘটনার পিছনে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ বা আরএসএস-এর সঙ্গে যুক্ত সংগঠন জনজাতি সুরক্ষা মঞ্চের নাম উঠে এসেছে। আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে এই সংগঠনটি দীর্ঘদিন ধরেই বেশ সক্রিয়। তাদের মূল উদ্দেশ্য হলো আদিবাসীদের নিজস্ব ঐতিহ্য ও আইডেন্টিটি রক্ষা করা এবং চিরাচরিত আদিবাসী বিশ্বাস বা ধর্ম থেকে ধর্মান্তরিত হওয়ার তীব্র বিরোধিতা করা। মাকতুব মিডিয়ার প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, এই সংগঠনের নেতৃত্বেই মূলত আদিবাসী খ্রিষ্টানদের উপর হিন্দু ধর্মে ফিরে আসার জন্য ধারাবাহিক চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। পাশাপাশি, ওই পরিবারগুলিকে সামাজিকভাবে বয়কট করার ঘটনাও প্রকাশ্যে এসেছে। সংবাদমাধ্যমের রিপোর্টে স্পষ্টতই উল্লেখ করা হয়েছে যে, দিনের পর দিন এমন বঞ্চনা চললেও পুলিশ বা স্থানীয় প্রশাসনের তরফ থেকে আক্রান্তদের সুরক্ষায় কোনো রকম পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। পুলিশের এই নিষ্ক্রিয়তা হামলাকারীদের আরও উৎসাহিত করেছে বলে মনে করা হচ্ছে।

ছত্তিশগড়ের বস্তার অঞ্চলে এই ধরনের ঘটনা একেবারেই নতুন নয়। গত কয়েক বছর ধরে এই এলাকার গ্রামগুলোতে আদিবাসী খ্রিষ্টানদের লক্ষ্য করে ধারাবাহিক বৈষম্য ও বর্জনের একটি সুনির্দিষ্ট ধরন লক্ষ করা যাচ্ছে। বিশেষ করে ২০২৫ এবং ২০২৬ সালের মধ্যে ঘটে যাওয়া একাধিক ঘটনার নথিপত্র থেকে জানা যায় যে, ধর্মান্তরিত আদিবাসীদের গ্রামের সাধারণ পানীয় জলের উৎস বা অন্যান্য সম্পদ ব্যবহার করতে দেওয়া হচ্ছে না। এমনকি স্থানীয় বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান থেকেও তাদের সম্পূর্ণভাবে বাদ দেওয়া হচ্ছে। খ্রিষ্টান সংবাদমাধ্যম এবং স্থানীয় অন্যান্য সংবাদমাধ্যমগুলোর রিপোর্টেও এই ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার কথা বারবার উঠে এসেছে।

ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে স্থানীয় স্তরে এমন তীব্র বিভাজন বস্তার অঞ্চলের আর্থ-সামাজিক অবস্থাকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলেছে। সাধারণ সম্পদের উপর অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়া এবং নিজেদের বাসভূমিতে ফেরার উপর নিষেধাজ্ঞার ফলে এই আদিবাসী খ্রিষ্টান পরিবারগুলোর বেঁচে থাকার লড়াই ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে।

বাংলাকাল-কে ফলো করুন

Facebook Comments Box

Discover more from বাংলাকাল

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Leave a Comment

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply