নয়াদিল্লি, ১১ অগাস্ট:
ই২০ পেট্রলে উচ্চ মাত্রার ক্লোরাইড এবং আর্দ্রতার উপস্থিতি নিয়ে সম্প্রতি দেশজুড়ে ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। সোসাইটি অফ ইন্ডিয়ান অটোমোবাইল ম্যানুফ্যাকচারার্স বা সিয়াম-এর একটি অভ্যন্তরীণ চিঠিকে কেন্দ্র করে এই নজিরবিহীন বিতর্কের সূত্রপাত হয়। গত ২৮ জুলাই, ২০২৬ তারিখে ভারতের পেট্রোলিয়াম সচিবকে লেখা সিয়ামের ওই চিঠিতে ই২০ পেট্রলের গুণগত মান নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছিল। তবে বিতর্ক শুরু হওয়ার মাত্র কয়েকদিনের মধ্যেই সিয়াম তাদের সেই চিঠি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাহার করে নেয়। এরই মধ্যে বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষক তেহসিন পুনাওয়ালা ওই চিঠির প্রতিলিপি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করে অভিযোগ তুলেছেন যে, সরকার এই গুরুত্বপূর্ণ নথিটি সাধারণ মানুষের নজর থেকে আড়াল করে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে জাতীয় রাজনীতি এবং দেশের শিল্প মহলে ব্যাপক চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে এবং ই২০ পেট্রলের মান নিয়ে সাধারণ গ্রাহকদের মনেও গভীর সংশয় তৈরি হয়েছে।
পেট্রোলিয়াম সচিবকে লেখা সিয়ামের ওই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং বিস্তারিত চিঠিতে যানবাহনের ক্ষেত্রে ই২০ পেট্রল ব্যবহারের কিছু মারাত্মক ক্ষতিকর দিক স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছিল। চিঠির তথ্য অনুযায়ী, যানবাহনের ফুয়েল ট্যাঙ্কে ক্লোরাইডের মাত্রা প্রতি কিলোগ্রামে ৫০০ মিলিগ্রাম এবং পেট্রল পাম্প বা খুচরো বিক্রির আউটলেটগুলোতে প্রতি কিলোগ্রামে ৩৫০ মিলিগ্রাম পর্যন্ত পাওয়া গিয়েছে, যা স্বাভাবিক মাত্রার থেকে বহুগুণ বেশি এবং অত্যন্ত উদ্বেগজনক। সিয়াম তাদের পেশাদার পর্যবেক্ষণে জানিয়েছিল যে, ই২০ পেট্রল দেশজুড়ে ব্যাপকভাবে চালু হওয়ার পর থেকে এই মাত্রাতিরিক্ত ক্লোরাইড এবং আর্দ্রতার কারণে গাড়ির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশগুলো ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিশেষ করে যানবাহনের ফুয়েল ইনজেক্টর, ফুয়েল পাম্প, ইজিআর ভালভ এবং এগজস্ট বা ধোঁয়া নির্গমন ব্যবস্থার যন্ত্রাংশগুলোতে দ্রুত ক্ষয় হচ্ছে বা জং ধরে যাচ্ছে এবং সেগুলো সময়ের অনেক আগেই সম্পূর্ণ বিকল হয়ে যাচ্ছে। এই প্রযুক্তিগত এবং আর্থিক ক্ষতির হাত থেকে বাঁচতে চিঠিতে ব্যুরো অফ ইন্ডিয়ান স্ট্যান্ডার্ডস বা বিআইএস-এর নিয়ম আরও কঠোর করার সুস্পষ্ট প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। সিয়াম জোরালোভাবে দাবি করেছিল যে, ই২০ পেট্রলে ক্লোরাইডের মাত্রা যেকোনো মূল্যে প্রতি কিলোগ্রামে ১.০ মিলিগ্রামের নিচে রাখা বাধ্যতামূলক করতে হবে এবং খুচরো আউটলেটগুলোতে পেট্রলের গুণগত মান বজায় রাখতে প্রশাসনিক নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা আরও কয়েকগুণ জোরদার করতে হবে।
এই গোপন চিঠিটি কোনোভাবে সংবাদমাধ্যমে ফাঁস হওয়ার পর তেহসিন পুনাওয়ালা তাঁর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অত্যন্ত তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। তিনি চিঠির ছবিগুলো সকলের উদ্দেশ্যে শেয়ার করে এটিকে একটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে চাপা দেওয়া বা ধামাচাপা দেওয়া নথি হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তিনি সরাসরি অভিযোগ করেন যে, সরকার নিজেদের চরম ত্রুটি এবং গাফিলতি ঢাকতেই এই নথিটি মুছে ফেলার বা জনসমক্ষ থেকে গোপন করার মরিয়া চেষ্টা করেছিল। তিনি দেশের সাধারণ মানুষকে এই নথিটি অবিলম্বে নিজেদের কাছে ডাউনলোড করে রাখার এবং বৃহত্তর জনস্বার্থে এর বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে উপযুক্ত রাজনৈতিক পদক্ষেপ নেওয়ার উদাত্ত আহ্বান জানান। সংবাদমাধ্যমে এই স্পর্শকাতর বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক চর্চা এবং রাজনৈতিক মহলে জলঘোলা শুরু হওয়ার পরেই পুরো পরিস্থিতি সম্পূর্ণ অন্যদিকে মোড় নিতে শুরু করে।
বিতর্ক ক্রমশ চরম আকার ধারণ করলে গত ৪ এবং ৫ অগাস্ট সিয়াম তাদের পূর্ববর্তী কঠোর অবস্থান থেকে একধাপ সরে আসে এবং আনুষ্ঠানিকভাবে বিতর্কিত চিঠিটি প্রত্যাহার করে নেয়। চিঠি প্রত্যাহারের স্বপক্ষে যুক্তি দিয়ে অটোমোবাইল প্রস্তুতকারক সংস্থাগুলোর এই শীর্ষ সংগঠনটি জানায় যে, চিঠিতে উল্লেখিত পরিসংখ্যান এবং তথ্যগুলোর জন্য দেশব্যাপী আরও ব্যাপক স্তরে তথ্য যাচাইকরণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা প্রয়োজন। এছাড়া, এই বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে সরকার এবং সংশ্লিষ্ট সকল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আরও বিস্তারিত আলোচনার দরকার রয়েছে বলেও তারা তাদের আনুষ্ঠানিক স্পষ্টীকরণে উল্লেখ করে।
অন্যদিকে, এই সামগ্রিক বিতর্কের প্রেক্ষিতে ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত তেল বিপণনকারী সংস্থাগুলো বা ওএমসিগুলোও তড়িঘড়ি ময়দানে নেমে তাদের বক্তব্য স্পষ্ট করেছে। তারা দেশের সাধারণ গ্রাহকদের আশ্বস্ত করে জানিয়েছে যে, ই২০ পেট্রলের গুণগত মান নিয়ে অহেতুক আতঙ্কিত হওয়ার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। তেল সংস্থাগুলোর পেশ করা পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সম্প্রতি দুই হাজারেরও বেশি পেট্রলের নমুনা অত্যন্ত নিখুঁতভাবে পরীক্ষা করে মাত্র দুটি ক্ষেত্রে ক্লোরাইডের উপস্থিতির প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে। পেট্রলের সর্বোচ্চ মান সুনিশ্চিত করতে বর্তমানে দেশজুড়ে থাকা ৮৭ হাজারেরও বেশি খুচরো পেট্রল পাম্পে প্রতিদিন ৮ থেকে ১২ বার উন্নত প্রযুক্তির সাহায্যে জলের উপস্থিতি বা আর্দ্রতা পরীক্ষা করা হচ্ছে বলে তারা জানিয়েছে। এছাড়া, পেট্রলে ইথানল মেশানোর ক্ষেত্রে ৩ পিপিএম ক্লোরাইড নির্দেশিকা বর্তমানে সম্পূর্ণ কঠোরভাবে মেনে চলা হচ্ছে। তেল বিপণনকারী সংস্থাগুলো অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে দেশবাসীকে জানিয়েছে যে, বর্তমানে গ্রাহকদের যে ই২০ পেট্রল সরবরাহ করা হচ্ছে, তা সরকারের সমস্ত নির্ধারিত গুণগত মান সম্পূর্ণভাবে পূরণ করছে এবং তা যেকোনো যানবাহনের ইঞ্জিনের জন্যই একশো শতাংশ নিরাপদ।
Discover more from বাংলাকাল
Subscribe to get the latest posts sent to your email.

