কলকাতা, ১২ আগস্ট:
ভারতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় টেলিকম সংস্থা ভারতী এয়ারটেল তাদের প্রিপেইড গ্রাহকদের জন্য একটি বড়সড় পরিবর্তন নিয়ে এল। সারা দেশ জুড়ে বেশ কয়েকটি অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং সাশ্রয়ী প্রিপেইড রিচার্জ প্ল্যান সম্পূর্ণভাবে বাতিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এই টেলিকম জায়ান্ট। যে রিচার্জ প্ল্যানগুলি বাতিল করা হয়েছে তার মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হল ২৯৯ টাকার বহুল ব্যবহৃত প্রিপেইড প্ল্যানটি। এছাড়াও ৩১৯ টাকা, ৫৭৯ টাকা, ৬১৯ টাকা, ৬৪৯ টাকা এবং ৭৯৯ টাকার মতো জনপ্রিয় প্রিপেইড প্ল্যানগুলিও এয়ারটেল তাদের বর্তমান পোর্টফোলিও থেকে পাকাপাকিভাবে সরিয়ে দিয়েছে। দীর্ঘদিনের তীব্র প্রতিযোগিতার পর ভারতের টেলিকম বাজারে যখন বিভিন্ন সংস্থা ধীরে ধীরে মাসুল বা ট্যারিফ বাড়ানোর পথে হাঁটছে, ঠিক সেই সময়েই এয়ারটেলের এই নতুন পদক্ষেপ সাধারণ গ্রাহকদের খরচের বোঝা অনেকটাই বাড়িয়ে দেবে বলে মনে করছেন বাজার বিশেষজ্ঞরা।
২৯৯ টাকার যে প্ল্যানটি এয়ারটেল তুলে নিল, সেটি এতদিন ধরে গ্রাহকদের মধ্যে সর্বাধিক জনপ্রিয় ছিল। এই নির্দিষ্ট প্ল্যানে গ্রাহকরা ২৮ দিনের জন্য আনলিমিটেড কলিং এবং প্রতিদিন ১.৫ জিবি ডেটা ব্যবহারের সুযোগ পেতেন। কিন্তু এখন থেকে সেই সুবিধা আর পাওয়া যাবে না। ২৯৯ টাকার প্ল্যানটি বাতিল হওয়ার ফলে এয়ারটেল গ্রাহকদের জন্য এখন সবচেয়ে সস্তা আনলিমিটেড রিচার্জ প্ল্যান হিসেবে উঠে এসেছে ৩৪৯ টাকার প্ল্যানটি। এর সহজ অর্থ হল, যে গ্রাহকরা আগে ২৯৯ টাকায় আনলিমিটেড কলিং এবং রোজকার ডেটা সুবিধা পেতেন, এখন তাঁদের সেই একই মেয়াদের জন্য অতিরিক্ত ৫০ টাকা বেশি খরচ করতে হবে। নতুন ৩৪৯ টাকার এই প্ল্যানে গ্রাহকদের ২৮ দিনের বৈধতা দেওয়া হচ্ছে এবং প্রতিদিন ২ জিবি করে ডেটা প্রদান করা হচ্ছে। অর্থাৎ, খরচ আগের তুলনায় অনেকটাই বাড়লেও গ্রাহকরা প্রতিদিন হাফ জিবি বেশি ডেটা ব্যবহারের সুযোগ পাবেন।
টেলিকম বিশেষজ্ঞদের মতে, আনলিমিটেড প্ল্যানের এই প্রারম্ভিক খরচ বৃদ্ধির ফলে সাধারণ গ্রাহকদের ওপর প্রায় ১৬ থেকে ১৭ শতাংশ কার্যকর মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়বে। তবে এই অতিরিক্ত খরচের বিনিময়ে এয়ারটেল তাদের গ্রাহকদের শুধুমাত্র বাড়তি ডেটাই দিচ্ছে না, এর সঙ্গে আরও বেশ কিছু অতিরিক্ত সুবিধা যোগ করেছে। যার মধ্যে অন্যতম হল অ্যাপল মিউজিকের মতো প্রিমিয়াম সাবস্ক্রিপশন পরিষেবা বিনামূল্যে উপভোগ করার সুযোগ। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, প্ল্যানের এই রদবদল আসলে সংস্থার দীর্ঘমেয়াদী ব্যবসায়িক কৌশলেরই একটি অংশ। এর মাধ্যমে এয়ারটেল অত্যন্ত সুকৌশলে তাদের গ্রাহক প্রতি গড় রাজস্ব বা অ্যাভারেজ রেভিনিউ পার ইউজার (এআরপিইউ) বৃদ্ধি করার লক্ষ্যমাত্রা গ্রহণ করেছে।
সম্প্রতি চলতি অর্থবর্ষের প্রথম ত্রৈমাসিকে অত্যন্ত শক্তিশালী এবং ইতিবাচক আর্থিক ফলাফল ঘোষণা করেছে ভারতী এয়ারটেল। আর এই আর্থিক সাফল্যের ঠিক পরেই এমন একটি বড় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করল সংস্থাটি। বাজারে দীর্ঘদিন ধরে অন্যান্য টেলিকম অপারেটরদের সঙ্গে তীব্র দামের লড়াই চলার পর, বর্তমানে প্রায় সব সংস্থাই নিজেদের ব্যবসার মুনাফা বাড়াতে এবং ফাইভ-জি পরিষেবা ও পরিকাঠামোর উন্নয়নে নজর দিচ্ছে। সেই ধারাবাহিকতা বজায় রেখেই এয়ারটেল তাদের প্রিপেইড পোর্টফোলিওতে এই গুরুত্বপূর্ণ এবং বাছাই করা পরিবর্তনগুলি আনল। কম দামের প্ল্যানগুলি বাতিল করার ফলে যে সমস্ত গ্রাহকের প্রতিদিন খুব বেশি ডেটার প্রয়োজন নেই, তাঁদেরকেও এখন বাধ্য হয়ে বেশি দামের প্ল্যান রিচার্জ করতে হবে, যা সংস্থার সামগ্রিক আয় বাড়াতে সরাসরি সাহায্য করবে।
টেলিকম বাজারের সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনা করলে দেখা যায়, ভারতের টেলিকম শিল্প বর্তমানে একটি অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক পর্যায় পেরিয়ে স্থিতিশীলতা ও লাভের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। বিগত কয়েক বছরে সস্তা ডেটা এবং আনলিমিটেড কলিংয়ের যে অভূতপূর্ব প্রতিযোগিতা দেখা গিয়েছিল, তা থেকে বেরিয়ে এসে প্রতিটি সংস্থাই এখন তাদের পরিষেবার গুণমান বৃদ্ধি এবং আর্থিক কাঠামোর উন্নতির দিকে মনোযোগ দিচ্ছে। এয়ারটেলের এই বাছাই করা পোর্টফোলিও পরিবর্তনের পদক্ষেপ সেই বৃহত্তর প্রক্রিয়ারই একটি সুস্পষ্ট প্রতিফলন। আগামী দিনে এই মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব সাধারণ গ্রাহকদের রিচার্জের অভ্যাসে কতটা পরিবর্তন আনে এবং অন্যান্য প্রতিযোগী টেলিকম সংস্থাগুলিও নিজেদের পোর্টফোলিওতে অনুরূপ কোনো পরিবর্তন আনে কিনা, তার দিকেই এখন নজর টেলিকম দুনিয়ার বিশেষজ্ঞদের।
Discover more from বাংলাকাল
Subscribe to get the latest posts sent to your email.

